চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নীরব কান্না

রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নীরব কান্না

মোহাম্মদ আলী

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজিরা স্টেটে বসবাস করতেন রাউজানের পশ্চিম গহিরা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মাহফুজ। বিগত ২৬ বছরে তিনি সেখানে গড়ে তুলেছেন ব্যবসা। বর্তমানে সেখানে তার রয়েছে গ্রিল ওয়ার্কশপ। সুযোগ পেলে তিনি দেশে ছুটি কাটাতে আসেন। স্ত্রীর অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি চলতি বছরের ২০ মে দেশে আসেন। গত ২৬ আগস্ট আমিরাতে চলে যাওয়ার বিমান টিকেট নির্ধারিত ছিল। কিন্ত গত ২২ আগস্ট তিনি জানতে পারেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার ভিসা বাতিল হয়ে গেছে। এতে বেকায়দায় পড়ে যান এ রেমিট্যান্স যোদ্ধা।

 

জানতে চাইলে পূর্বকোণকে তিনি বলেন, ‘আমিরাতের ফুজিরায় আমার ব্যবসা রয়েছে। দেশে আসার পর আমার ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ায় বড় সমস্যায় পড়ে গেছি। ফুজিরায় ২৬ বছরে তিলে তিলে গড়ে তোলা আমার ব্যবসা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। ভিসা বাতিল হওয়ায় এখন আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি।’

 

আবদুল্লাহ আল মাহফুজের মতো সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে গত ১৭ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন আরেক রেমিট্যান্স যোদ্ধা রাউজানের মধ্যম কদলপুর গ্রামের ছমদ আলী চৌধুরী বাড়ির মৃত ইসহাক চৌধুরীর পুত্র মোহাম্মদ ফারুক চৌধুরী। শুরুতে চাকরি দিয়ে তার প্রবাস জীবনের যাত্রা হলেও কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি সেখানে ঠিকাদারিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। যে কোন ভবনের ইলেকট্রিক কাজে ঠিকাদারি করতেন তিনি। এ কাজে তিনি ধীরে ধীরে অভিজ্ঞও হয়ে ওঠেন। তাতে তার ব্যবসার পরিধিও বাড়তে থাকে। প্রায় প্রতিবছর সময় সুযোগ পেলে তিনি ছুটি কাটাতে দেশে আসতেন। কিছুদিন থাকার পর পুনরায় আমিরাতে ফিরে যেতেন। এভাবে কেটে যাচ্ছে তার প্রবাস জীবন। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল দেশে বেড়াতে আসেন ফারুক চৌধুরী। আগস্টে তার চলে যাওয়ার বিমানের রিটার্ন টিকেটও নির্ধারিত ছিল। কিন্ত দেশে থাকা অবস্থায় গত ২২ জুলাই তার ভিসা বাতিল হয়ে যায়। তাতে হতাশায় ভেঙে পড়েন এ রেমিট্যান্স যোদ্ধা।

 

পূর্বকোণকে তিনি বলেন, ‘কী কারণে আমার ভিসা বাতিল তাও জানতে পারছি না। আমার সবকিছু ঠিকঠাক রয়েছে। আশা করছি সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর একটা পদক্ষেপ নেবেন।’

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিল করা হয়েছে। আমিরাতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বিষয়কে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হলেও ঠিক কী কারণে এত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির ভিসা বাতিল করা হচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পায়নি বাংলাদেশ। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীরা। আমিরাতে ফেরার প্রস্তুতির মধ্যে ভিসা বাতিলের তথ্য পাওয়ায় তাদের অনেকেই আর কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। ফলে দীর্ঘদিনের চাকরি, ব্যবসা, পরিবার ও সেখানে গড়ে তোলা সম্পদ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন তারা।

 

ভুক্তভোগী প্রবাসীদের ভাষ্য, জুলাই থেকে অনেকের ভিসা কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। কারও কাছে ই-মেইল, কারও মোবাইল ফোনে বার্তা এবং কারও ক্ষেত্রে কফিলের মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হচ্ছে।

 

দেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, আমিরাতে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা গ্রেপ্তারসংক্রান্ত অভিযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে চাকরি কিংবা ব্যবসা করে সেখানে পরিবার ও সম্পদ গড়ে তুলেছেন তারা। কিন্তু ভিসা বাতিলের পর দেশে আটকে পড়ায় আয়-রোজগার বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি আমিরাতে থাকা সম্পদ ও ব্যবসা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 

এ পরিস্থিতিতে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ভিসা পুনর্বিবেচনাই নয়, আমিরাতের বিশাল শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিশ্চিত করতেও দ্রæত কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

 

সেন্টার ফর এনআরবির চেয়ারম্যান এম এস শেকিল চৌধুরীর মতে, ভিসা বাতিলের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাবও থাকতে পারে। তার পরামর্শ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করা অভিজ্ঞ প্রবাসী ও কূটনীতিকদের সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

 

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভিসা বাতিলের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জনে পৌঁছেছে। বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

 

এদিকে ভিসা বাতিল হওয়া বাংলাদেশিদের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে আবুধাবিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। সরকারের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র দ্রুত দূতাবাসের নির্ধারিত ই-মেইলে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে। এসব তথ্য একত্র করে দূতাবাসের মাধ্যমে আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এখন মূল লক্ষ্য, ভিসা বাতিলের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা এবং সম্ভব হলে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের ভিসা পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা করা।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট