চট্টগ্রাম শনিবার, ০২ মে, ২০২৬

সর্বশেষ:

অডিট নিয়ে দুটি কথা

আসাদ হাফিজ

২ মে, ২০২৬ | ১২:৪৮ অপরাহ্ণ

সাম্প্রতিক সময়ে আয়কর রিটার্ন অডিট নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ Risk Based Automated Selection System এর মাধ্যমে করদাতার Risk Factor এর উপর ভিত্তি করে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের মধ্য হতে ৭২,৩৪১টি রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করেছে।

করদাতাদের রিটার্ন অডিট আগেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে, এটি একটি নিয়মিত বিষয়, কিন্তু এখানে যে বিষয়টি আমাকে নাড়া দিয়েছে তাহলো, নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করদাতাদের টিআইএন উন্মুক্ত করার ফলে তরুণ একটি শ্রেণি এটিকে লুফে নিয়েছে এবং অতি দ্রুত ছোট ছোট অনলাইন বেজড টুলস তৈরি করার মাধ্যমে আপনার রিটার্নটি নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছে কি না তা জানার সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলে আমার মতে ন্যূনতম ২টি বিষয় ঘটেছে (অন্যের মতে আরো বেশি হতে পারে), তা হলো – প্রথমত, যারা এ টুলসগুলো তৈরি করেছে তারা হয়তো করদাতাই নন, বয়সে তরুণ, করদাতা হওয়ার হয়তো বয়সও হয়নি এখনো, তারা যেমন আয়কর বিষয় জানতে আগ্রহী হচ্ছে, তেমনি করদাতা আয়কর রিটার্নে ভুল করলে রিটার্ন সংশোধনের সুযোগ পাচ্ছেন,

দ্বিতীয়ত, অনেক সময় একটি চক্র আপনার রিটার্ন অডিটে পড়েছে বলে আপনাকে দেখা করতে বলত, অথবা টাকা দিলে আপনার রিটার্ন অডিটমুক্ত রাখবে, এ জাতীয় হয়রানি করদাতাদের করা হতো যেহেতু অডিটের তালিকাটি উন্মুক্ত ছিল না। শুধুমাত্র তালিকাটি সার্কেলে প্রেরণ করা হতো এবং সার্কেল পত্র মারফত করদাতাকে অবহিত করত। তা জানাতে অনেক সময় বিলম্ব হতো, অনেক সময় ফেক পত্র তৈরি করে করদাতাকে হয়রানি করা হতো। অডিটের তালিকাটি উন্মুক্ত হওয়ার ফলে এখন আর এ সুযোগ থাকবে না, করদাতা প্রকাশিত তালিকায় তার টিআইএন আছে কিনা নিজে বের করতে পারবেন (তাতে হয়তো একটু বেশি সময় লাগবে), আবার তরুণ প্রজন্ম কর্তৃক উদ্ভাবিত অডিট চেকার দিয়ে নিমিষেই করদাতার রিটার্নটি নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছে কিনা তা জানতে পারবে।

স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অডিটের জন্য আয়কর রিটার্ন বাছাই ও তা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্মানিত চেয়ারম্যান, সকল সম্মানিত সদস্য এবং আইটি টিম যারা স্বয়ংক্রিয় এ পদ্ধতি তৈরি করেছেন – সকলেই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। আমরা সকলকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

এখন একটু অডিট সংক্রান্ত আইন নিয়ে আলোচনা করা যাক-

অডিটের আইনগত ভিত্তি কি?

করদাতা আয়কর আইন, ২০২৩ এর ১৮০ ধারায় স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে আয়কর রিটার্ন ও সংশোধিত আয়কর রিটা‍র্ন দাখিল করেন। রিটার্ন দাখিলের পর জাতীয় রাজ্স্ব বোর্ড ১৮২ ধারায় কতিপয় রিটার্নকে নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করে।

কর কর্মকর্তার করণীয় কি?

(১) অনুমোদিত তালিকা পাওয়ার পর কর কমিশনার ৭ দিনের মধ্যে উহা সংশ্লিষ্ট সার্কেলে প্রেরণ করবেন।

(২) সার্কেল তালিকা পাওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে সকল করদাতাকে লিখিতভাবে তার রিটার্নটি নিরীক্ষার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তা অবহিত করবেন।

(৩) পরবর্তীতে নিরীক্ষাধীন রিটার্নের ত্রুটি-বিচ্যুতি উল্লেখপূর্বক করদাতার নিকট ব্যাখ্যা চাইবেন।

(৪) প্রয়োজনে কর পরিদর্শক দ্বারা বা নিজে বা একাধিক কর পরিদর্শক দ্বারা তদন্ত টিম করে তদন্ত করাবেন (বাধ্যতামূলক নয়)।

(৫) নিরীক্ষায় উত্থাপিত বিষয়ের সত্যতা না পাওয়া গেলে যুগ্ম/অতিরিক্ত কর কমিশনারের অনুমোদনক্রমে করদাতাকে নিরীক্ষা কার্যক্রম হতে অব্যাহতি প্রদান করবেন।

(৫) নিরীক্ষায় উত্থাপিত বিষয়সমূহের সত্যতা পাওয়া গেলে এক বা একাধিক কর পরিদর্শক দ্বারা তদন্ত করাবেন।

(৬) এর পরে উপ কর কমিশনার অডিট প্রতিবেদন প্রস্তুত করবেন ও করদাতাকে অবহিত করবেন এবং সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের অনুরোধ করবেন।

(৭) সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করলে এবং অডিট প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিষয়সমূহ উক্ত রিটার্নে যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা হলে সার্কেল কর্মকর্তা উক্ত রিটার্ন গ্রহণ করবেন এবং মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে মর্মে করদাতাকে একটি পত্র দিবেন।

(৭) সংশোধিত রিটার্ন দাখিল না করলে বা দালিখ করলেও তাতে উত্থাপিত বিষয়সমূহ সমাধান করা না হলে সার্কেল কর্মকর্তা কর নির্ধারণ কার্য সম্পন্ন করবেন।

(৮) এ পুরো প্রক্রিয়াটি আয়কর আইন, ২০২৩ এর ১৯৭ ধারা অনুযায়ী ৩০ জুন ২০২৮ এর মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।

করদাতার করণীয় কি?

(১) প্রথমেই করদাতা তালিকা চেক করে নিশ্চিত হবেন তার রিটার্নটি নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছে কি না।

(২) নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হলে রিটার্নটি নিজে ভাল করে নিরীক্ষা করবেন কোথাও ত্রুটি রয়েছে কিনা।

(৩) ত্রুটি পরিলক্ষিত না হলে মামলাটি নিরীক্ষার কার্যক্রম হতে অব্যাহতির জন্য সার্কেলে লিখিতভাবে আবেদন করতে পারেন।

(৪) ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে প্রযোজ্য কর পরিশোধপূর্বক সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করে নিরীক্ষা কার্যক্রম হতে অব্যাহতি চাইতে পারেন।

(৫) অপেক্ষা করতে পারেন কর অফিস কি করে এবং কর অফিসের কার্যক্রম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।

(৬) প্রয়োজনে একজন বিজ্ঞ আয়কর আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করতে পারেন।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট