চট্টগ্রাম শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬

গাড়ি ঘোরালেই ১৩০টাকা...

বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল

গাড়ি ঘোরালেই ১৩০ টাকা…

তাসনীম হাসান

৬ জুন, ২০২৬ | ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ

দুই পাশে সারি সারি গাড়ি। কোনোটি ঠাঁই দাঁড়িয়ে, ভেতরে আড্ডায় মশগুল চালক-সহকারীরা। কোনোটি আবার যাত্রীর জন্য হাঁক ডাকতে ডাকতে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। পড়তে পড়তে মনে হবে ব্যস্ত কোনো টার্মিনালের গল্প এটি। না, টার্মিনালে নয়-সড়কের দুই পাশকেই স্টেশন বানিয়ে ফেলেছেন তারা। চট্টগ্রামের অন্যতম পুরনো আরাকান সড়কে রাত-দিন দেখা মিলছে এই চিত্রের। অথচ কাছেই থাকা বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালের অনেক জায়গায় ফাঁকা।

বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে চান্দগাঁও থানা মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই পাশ বহুদিন ধরেই এভাবে গাড়ি চালকেরা দখল করে রেখেছেন। অন্যদিকে স্বাধীনতা কমপ্লেক্সের সামনেও সড়কের দুই পাশে একইভাবে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। শুধু গাড়ি রাখা নয়, গাড়ি ঘোরানো-ধোয়া-মোছা সবই করা হয় সড়কের ওপরেই। বড় অংশ গাড়ির দখলে থাকায় ব্যস্ততম সড়ক দুটিতে নিয়মিত লেগে থাকছে যানজট।

 

তবে গাড়ি চালক ও সহকারীরা বলছেন-বাস টার্মিনালে গাড়ি রাখলে কিংবা শুধু ঘোরালেও ১৩০ টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে। আর এই টাকাটা কাটা পড়ে নিজেদের বেতন থেকেই। সেজন্য চাঁদা এড়াতে তারা বাধ্য হয়ে সড়কে গাড়ি রাখছেন।

 

শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালটি ৩৩ বছর ধরে ১১টি মালিক সমিতির কাছে ইজারা দিয়ে আসছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ঐই সময়ে কয়েকবছর পর পর ইজারা নবায়ন করা হতো। কিন্তু গত জানুয়ারিতে অন্যদের

টার্মিনালটি ইজারা দিয়েছে সিডিএ। এরপর থেকেই জটিলতার শুরু। মালিক সমিতির হাতে যখন ইজারা ছিল তখন গাড়ি রাখতে কোনো চাঁদা দিতে হতো না, কিন্তু এখন গাড়ি প্রতি ১৩০ টাকা করে গুণতে হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব গাড়ি মালিক সমিতির আওতাভুক্ত নয়-সেগুলোকেই এই চাঁদা দিতে হচ্ছে।

 

গতকাল শুক্রবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, দুই লেনের সড়কটির দুই পাশেই সারি সারি বাস। এ কারণে গাড়ি চলাচল করতে সমস্যা হচ্ছিল । আবার নিয়মিত গাড়ি রাখায় সড়কের ওই অংশ পরিচ্ছন্ন কর্মীরা পরিষ্কার করতে পারেন না, যার কারণে জমে আছে ময়লা। বৃষ্টি পড়লেই সড়কে কাঁদাপানি খেলা করে। অথচ ওই সময়ে টার্মিনালের ভেতরে প্রায় এক তৃতীয়াংশ জায়গা খালি ছিল।

এ সময় কথা হয় বাস চালকের দুই সহকারীর সঙ্গে। তাঁরা বলেন, ‘আগে কখনো গাড়ি রাখতে বা ঘোরাতে টাকা দিতে হয়নি। কিন্তু কয়েকমাস ধরে গাড়ি ঘোরালেই ১৩০টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছে।

 

এই টাকাটা মালিক দেন না, আমাদের পকেট থেকেই দিতে হচ্ছে। আমরা এক ট্রিপে ৩০০টাকা বেতন পাই, সেখান থেকে যদি এত টাকা চাঁদা দিয়ে ফেলতে হয় আমরা খাব কী?

 

টার্মিনালের ভেতরে বাস রাখা ঈগল পরিবহনের দুজন চালকের কথায় চাঁদার বিষয়টির সত্যতা পাওয়া যায়। তারা বলেন, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে গাড়ি রাখতে ১৩০টাকা করে দিতে হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা যায়, খাঁজা রোডের মুখের পাঁচ রাস্তার মোড়ে। ওই জায়গায় বড় বড় গাড়িগুলো ঘোরানো হলে সড়কের পাঁচদিকেই গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, এতে প্রায়সময় দীর্ঘক্ষণ যানজট লেগে থাকছে। ওই সময়ে এস আলম পরিবহনের একটি বাস ঘোরানো হচ্ছিল মোড়টিতে। সেটির চালকও ১৩০টাকা চাঁদা এড়াতে এই জায়গায় বাস ঘোরানোর কথা বলেন।

পাহারাদার বসিয়েছে ইজারাদার:
টার্মিনালটি ইজারা দেওয়া হলেও কারা নিয়েছেন সেটি জানেন না শ্রমিক নেতা থেকে শুরু করে শ্রমিকেরা। টার্মিনালে ইজারাদার কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যালয়ও পাওয়া যায়নি। তবে তাদের প্রতিনিধি রয়েছে।

 

দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে টার্মিনালে প্রবেশমুখেই বায়তুশ শরফ মসজিদ। গতকাল বিকেলে এই মসজিদের সামনে জ্যাকেট (ভেস্ট) পরা তিনজনকে দেখা যায়। তাদের সবার হাতেই পাইপের লাঠি। টার্মিনালে বাস ঢুকলে বা বের হলে ছুঁটে যান তাদের কেউ না কেউ। পরে আদায় করেন চাঁদা। তবে তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে আরাকান সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মুছা পূর্বকোণকে বলেন, ‘বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল স্থাপনের পর থেকে মালিক সমিতিই এটির ইজারা পেয়ে আসছিল। প্রতি দুই বছর পর পর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত টাকা দিয়ে এই মেয়াদ বাড়ানো হতো। কিন্তু এই বছর অন্যদের ইজারা দিয়েছে সিডিএ। তারা কারা আমরা জানি না। তাদের দেখাও যাচ্ছে না, শুধু কিছু লোকজনকে দেখছি আমরা। তারা গত পয়লা বৈশাখের পর থেকে গাড়িগুলো থেকে ১৩০ টাকা করে নিচ্ছে। গাড়ি ঘোরালেই নাকি এই টাকা দিতে হচ্ছে। যেটা আগে নেওয়া হতো না। এসব নিয়ে একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমরা চাই টার্মিনালে শৃঙ্খলা আসুক। গাড়ি যেন কোনোভাবেই সড়কে রাখা না হয়।’

 

জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম পূর্বকোণকে বলেন, ‘প্রতি গাড়িতে সর্বোচ্চ ৫০টাকা পর্যন্ত নেওয়া যাবে। এভাবে বাড়তি টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। সড়কেও গাড়ি রাখা যাবে না। অনিয়ম হয়ে থাকলে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পূর্বকোণ/রাকিব

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট