চট্টগ্রাম শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

চট্টগ্রাম সবার পাশে, চট্টগ্রামের পাশে কে

তাসনীম হাসান

১১ জুলাই, ২০২৬ | ১২:৫৩ অপরাহ্ণ

প্রবাদ আছে-চট্টগ্রামের মানুষের কলিজা বড়। কোথাও দুর্যোগ মানেই বারো আউলিয়ার এই জনপদের মানুষকে দেখা যায় সবার আগে ছুটে যেতে। কেউ ত্রাণভর্তি ট্রাক নিয়ে, কেউ নৌকা নিয়ে, কেউ রক্ত দিতে, কেউ আবার নিজের সঞ্চয়ের শেষ টাকাটুকু তুলে দিয়েছেন অচেনা মানুষের হাতে। দেশের প্রতিটি বিপর্যয়ে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সেই চট্টগ্রাম আজ নিজেই বিপদে!

টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন বিধ্বস্ত। লাখো মানুষ আশ্রয়, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। পাহাড় ধস আর বন্যার পানিতে অনেকে হারিয়েছেন স্বজন। আর এই বিপর্যয়ের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত জনপদের অলিগলি থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবখানেই ঘুরে ফিরে উচ্চারিত হচ্ছে একটি প্রশ্ন, সব দুর্যোগে সবার আগে ছুটে যাওয়া চট্টগ্রাম, নিজের দুর্যোগে কেন এতটা একা?

চট্টগ্রামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা বলছেন, অতীতে দেশের অন্য অঞ্চলে বন্যা বা দুর্যোগ হলে যেভাবে সারা দেশে ত্রাণ সংগ্রহ, মানবিক উদ্যোগ ও সামাজিক আন্দোলনের ঢেউ উঠতে দেখা গেছে, এবার সেই চিত্র তুলনামূলক অনেকটাই অনুপস্থিত। জাতীয় গণমাধ্যমেও পুরো বিপর্যয়ের চিত্র যথাযথভাবে উঠে আসছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবশালী কনটেন্ট নির্মাতা, ব্লগার কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও তেমন সরব উপস্থিতি চোখে পড়ছে না।

অথচ টানা তিনদিন ধরে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, পেকুয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত পানির নিচে। এর আগে জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গিয়েছিল চট্টগ্রাম নগরের বহু নিম্নাঞ্চল। হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে, লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক পরিবার এখনো নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার করছে। তাদের প্রত্যাশা শুধু ত্রাণ নয়-পুরো দেশের মানুষের আন্তরিক সহমর্মিতাও।

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দুর্যোগ জাতীয় পর্যায়ে কতটা গুরুত্ব পাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে তথ্যপ্রবাহ, গণমাধ্যমের কাভারেজ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্যমানতার ওপর। ফলে কোথাও কোথাও বাস্তবতার তুলনায় কম কিংবা বেশি গুরুত্ব পাওয়ার অনুভ‚তি তৈরি হতে পারে। তাই চট্টগ্রামের মানুষের এই অনুভ‚তিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তবে সংকটের মধ্যেও হাত গুটিয়ে বসে নেই চট্টগ্রাম। এখানকার মানুষ বরাবরের মতো নিজেদের লড়াই নিজেরাই লড়ছেন। বিভিন্ন এলাকায় তরুণেরা নৌকা নিয়ে আটকে পড়া মানুষ উদ্ধার করছেন। কেউ রান্না করা খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ ওষুধ, কেউ বিশুদ্ধ পানি, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জরুরি সহায়তার সমন্বয় করছেন। অনেক ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনও নিজ উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে।

তবু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষদের দাবি, ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা বিবেচনায় এই উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দুর্গম এলাকায় দ্রæত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা সামগ্রী ও উদ্ধার সহায়তা পৌঁছে দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের পরিকল্পনাও এখন থেকেই শুরু করা প্রয়োজন।

বাঁশখালীর সন্তান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আদনান মান্নান ফেসবুকে বন্যাকবলিত মানুষের দুর্দশার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। শেষে তিনি লিখেছেন, ‘বাঁশখালীর দুঃসময়ে আপনারা কেউ পাশে ছিলেন না। আজও নেই। ভবিষ্যতেও থাকবেন-এমন আশ্বাস আমরা আর বিশ্বাস করতে পারি না।’

পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় কমেডি শো মীরাক্কেল-এর মাধ্যমে দুই বাংলায় পরিচিতি পাওয়া চকরিয়ার বাসিন্দা কমর উদ্দিন আরমানও একই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘প্রিয় উত্তরাঞ্চল, সিলেট বিভাগ ও ফেনীবাসী-আমরা দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ আজ বন্যায় কষ্টে আছি। আশা করি নিজেরাই এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠব। এরপর আবার যদি আপনাদের বন্যা হয়, ইনশাআল্লাহ চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মানুষ আগের মতোই আপনাদের পাশে ছুটে যাবে।’

বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত চট্টগ্রামের তরুণ নেজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ফেনীর বন্যার সময় আমরা চট্টগ্রাম থেকে ৪৩ জন তরুণ তিনটি নৌকা নিয়ে গিয়ে হাজারো মানুষ উদ্ধার করেছি। ২৬ দিন সেখানে থেকে ত্রাণ বিতরণ, মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা, টিউবওয়েল স্থাপন ও ঘর নির্মাণ করেছি। শুধু আমরা নই, চট্টগ্রামের হাজারো তরুণ তখন মানবিকতার টানে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু আজ চট্টগ্রামের বিপর্যয়ে বাইরের মানুষদের সেই সাড়া দেখতে পাচ্ছি না। এটা খুব কষ্ট দেয়।’

অবশ্য গতকাল শুক্রবার থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তৎপরতা বাড়তে শুরু করেছে। দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০টি পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও দুর্গত দুটি উপজেলা পরিদর্শন করেছেন। তবে ভুক্তভোগী মানুষের কথা একটাই-শুধু সরকার বা রাজনৈতিক দলের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজন পুরো জাতির সম্মিলিত মানবিক অবস্থান।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্যার পানি নেমে যাবে। ভাঙা ঘর আবার দাঁড়াবে। ক্ষতি পুষিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে সবাই। কিন্তু এই দুর্যোগে কে পাশে দাঁড়াল, আর কে নীরব থাকল-সেই স্মৃতি হয়তো চট্টগ্রামের মানুষের মনে আরও দীর্ঘদিন রয়ে যাবে!

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট