চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজ কি পারে না চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে বদলে দিতে?

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজ কি পারে না চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে বদলে দিতে?

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

১৪ আগস্ট, ২০২৬ | ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ

কল্পনা করুন- আপনি চট্টগ্রামের একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী। এক বিকেলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চট্টগ্রাম ক্লাব কিংবা রেডিসন ব্লু চট্টগ্রামে সময় কাটাচ্ছেন। হঠাৎ আপনার তীব্র বুকে ব্যথা শুরু হলো। পরিবারের সদস্যরা সঙ্গে সঙ্গে জরুরি চিকিৎসাসেবায় ফোন করলেন। অ্যাম্বুলেন্স এসে আপনাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিয়াক সেন্টারে নিয়ে গেল।

 

জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পরপরই অভিজ্ঞ কার্ডিওলজি দল আপনাকে মূল্যায়ন করল। দ্রæত ইসিজি ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হলো। এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই আপনার করোনারি এনজিওগ্রাম করা হলো। দেখা গেল হার্টের একটি ধমনী সম্পূর্ণ বন্ধ। সঙ্গে সঙ্গে স্টেন্ট বসানো হলো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আপনার বুকের ব্যথা চলে গেল, জীবন সংকট কেটে গেল। কয়েক দিনের মধ্যেই আপনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন। আপনাকে ঢাকায় যেতে হলো না। ভারতে, সিঙ্গাপুরে কিংবা ব্যাংককে চিকিৎসার জন্য ছুটতে হলো না। আপনার জীবন বাঁচল নিজের শহরেই, নিজের মানুষের হাতে।

 

এই দৃশ্য কি কেবল কল্পনা? না। এটি সম্পূর্ণ বাস্তব হতে পারে। যদি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীসমাজ সম্মিলিতভাবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হয়, তাহলে এমন একটি কার্ডিয়াক সেন্টার গড়ে তোলা অসম্ভব নয়। শুধু কার্ডিয়াক চিকিৎসাই নয়Ñএকইভাবে বিশ্বমানের ক্যান্সার সেন্টার, আধুনিক স্ট্রোক সেন্টার এবং আরও অনেক জীবনরক্ষাকারী সেবা গড়ে তোলা সম্ভব।

 

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীসমাজ ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। এখন সময় এসেছে সেই সাফল্যের একটি অংশ চট্টগ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিনিয়োগ করার। এই বিনিয়োগ শুধু দান হবে না; এটি হবে নিজের শহর, নিজের মানুষ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি একটি স্থায়ী অঙ্গীকার।

 

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, ইস্পাত শিল্প, জাহাজভাঙা শিল্প, গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ভোগ্যপণ্য, সিমেন্ট, আবাসন ও রপ্তানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই শহরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে দেশের বহু শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী-যেমন আবুল খায়ের গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, বিএসআরএম, পিএইচপি ফ্যামিলি, জিপিএইচ ইস্পাত, কেডিএস গ্রুপ, কেবিজি (কবির গ্রুপ), ওয়েল গ্রুপ, এশিয়ান গ্রুপ, ক্লিফটন গ্রুপ, প্যাসিফিক জিন্স সহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বার্ষিক ব্যবসার পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা। এই ব্যবসায়িক সাফল্য শুধু চট্টগ্রামের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের গর্ব। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজ সময়ের দাবি হয়ে উঠেছেÑএই শিল্পগোষ্ঠীগুলো কি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে আরও কৌশলগত ভূমিকা রাখতে পারে না? আমার বিশ্বাস, পারে। বরং এখনই সেই সময়।

 

আমাদের দেশে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান টিউবওয়েল স্থাপন, শীতবস্ত্র বিতরণ, হুইলচেয়ার প্রদান, খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কিংবা দুর্যোগে সহায়তার মতো প্রশংসনীয় কাজ করে থাকে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই মানবিক এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑএসব এককালীন অনুদান কি একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা গড়ে তোলে? উত্তর হলোÑখুব সীমিতভাবে।

 

একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দক্ষ জনবল, উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি, বিশেষায়িত ইউনিট, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং টেকসই অবকাঠামো। এগুলো গড়ে তুলতে দরকার পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ।

 

আমার অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, আমাদের ব্যবসায়িক নেতাদের অনেকেই স্বাস্থ্যখাতের প্রকৃত চাহিদা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পান না। তারা হয়তো আন্তরিকভাবে সাহায্য করতে চান, কিন্তু কোথায় বিনিয়োগ করলে সবচেয়ে বেশি মানুষের জীবন বাঁচবে, সে বিষয়ে তাঁদের কাছে সুসংগঠিত প্রস্তাব পৌঁছায় না। এখানেই চিকিৎসক সমাজ, হাসপাতাল প্রশাসন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষক, অ্যালামনাই এবং নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব। আমাদের উচিত চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ শুরু করা। তাঁদের কাছে আবেগের আবেদন নয়, বরং তথ্যভিত্তিক, পেশাদার এবং বাস্তবসম্মত প্রকল্প উপস্থাপন করা।

 

আমি মনে করি, প্রাথমিকভাবে তিনটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, ক্যান্সার চিকিৎসা। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ উন্নত ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য এখনও ঢাকায় যেতে বাধ্য হন। একটি আধুনিক ক্যান্সার সেন্টার, ডে-কেয়ার কেমোথেরাপি ইউনিট, উন্নত রেডিওথেরাপি সুবিধা, রোগীদের জন্য স্বল্পমূল্যের আবাসন এবং ক্যান্সার গবেষণায় করপোরেট অংশীদারিত্ব হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ কমাতে পারে। দ্বিতীয়ত, হৃদরোগ চিকিৎসা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আরও আধুনিক ক্যাথল্যাব, কার্ডিয়াক সার্জারি সুবিধা, করোনারি কেয়ার ইউনিট এবং কার্ডিয়াক পুনর্বাসন সেবা গড়ে তুলতে করপোরেট সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তৃতীয়ত, স্ট্রোক সেন্টার। বাংলাদেশে স্ট্রোক এখন মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। অথচ দ্রুত চিকিৎসার জন্য নিবেদিত স্ট্রোক ইউনিট, ২৪ ঘণ্টা ইমেজিং, থ্রম্বোলাইসিস, পুনর্বাসন ও জনসচেতনতা কার্যক্রম এখনও পর্যাপ্ত নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ স্ট্রোক সেন্টার প্রতিষ্ঠা হাজারো মানুষকে আজীবন পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা করতে পারে।

 

অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন-ব্যবসায়ীরা কেন এগুলো করবেন? উত্তর খুব সহজ। কারণ এই হাসপাতালেই তাঁদের প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক চিকিৎসা নেন, তাঁদের পরিবারের সদস্য চিকিৎসা নেন, তাঁদের কর্মচারীরা চিকিৎসা নেন। একটি শক্তিশালী সরকারি হাসপাতাল পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী করে। বিশ্বের শীর্ষ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, মেয়ো ক্লিনিক, জনস হপকিন্সসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান শুধু সরকারি অর্থায়নে গড়ে ওঠেনি। করপোরেট প্রতিষ্ঠান, দাতব্য ফাউন্ডেশন, সফল উদ্যোক্তা, অ্যালামনাই এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বই এসব প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বমানে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতি গড়ে তোলার সময় এসেছে। এজন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে একটি Healthcare Philanthropy and Development Office গঠন করা যেতে পারে। এখানে থাকবেন চিকিৎসক, হাসপাতাল প্রশাসক, অ্যালামনাই প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং পেশাদার ফান্ডরেইজিং বিশেষজ্ঞ। তাঁদের কাজ হবে সম্ভাব্য দাতাদের কাছে সুপরিকল্পিত প্রকল্প উপস্থাপন, অগ্রগতি জানানো, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে শুধু অনুদান দিতে বলা যথেষ্ট নয়। তাঁদের বোঝাতে হবেÑকোন প্রকল্পে বিনিয়োগ করলে কতজন রোগী উপকৃত হবেন, কত জীবন বাঁচবে, কীভাবে সেই প্রকল্প পরিচালিত হবে এবং কীভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। আমি বিশ্বাস করি, চট্টগ্রামের প্রতিটি বড় শিল্পগোষ্ঠী যদি একটি করে বড় স্বাস্থ্য প্রকল্প গ্রহণ করে, তাহলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব।

 

সরকারের ভূমিকা অবশ্যই অপরিহার্য। কিন্তু শুধুমাত্র সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। সরকার, চিকিৎসক সমাজ, অ্যালামনাই, নাগরিক সমাজ এবং ব্যবসায়ী সমাজÑএই পাঁচটি শক্তির সমন্বিত উদ্যোগই পারে একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছেন। এখন সময় এসেছে স্বাস্থ্যখাতেও একটি স্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার। হয়তো ভবিষ্যতে কোনো রোগীর পরিবার বলবে- ‘এই ক্যান্সার সেন্টারটি গড়ে উঠেছিল চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজের সহযোগিতায়।’ এর চেয়ে বড় সামাজিক বিনিয়োগ আর কী হতে পারে?

 

লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট