বাংলাদেশে ঋতু ছয়টি হলেও সবচেয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ ঋতুর নাম বর্ষা। সে কারও অনুমতি নিয়ে আসে না, কারও সময়সূচি দেখে নামে না, আর বিশেষ করে শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার রুটিনের প্রতি তার কোনো শ্রদ্ধাবোধ আছে বলেও মনে হয় না!
ছোটবেলায় বাংলা পরীক্ষায় ‘‘বর্ষাকাল’’ রচনা লিখতাম। প্রথম লাইনই হতো- ‘‘বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। বর্ষা ঋতু ঋতুর রাণী।’’ এরপর লিখতাম-‘‘চারদিকে সবুজের সমারোহ, ব্যাঙের ডাক, কদম ফুল, কবির মন নেচে ওঠে।’’ মনে হতো বর্ষাকাল বুঝি শুধু কবি, সাহিত্যিক আর রচনাপুস্তকের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু গ্রামের মানুষকে জিজ্ঞেস করলে উত্তরটা একটু অন্যরকম। তাদের কাছে বর্ষা মানেই দুর্দিন। ঘরবাড়ি ভাসে, রাস্তা ডুবে যায়, কাজ বন্ধ হয়, জ্বালানি কাঠ ভিজে যায়, বাজারে যাওয়া যায় না। একসময় গ্রামের অনেক বাড়িই ছিল খড়ের, বাঁশের বা টিনের। বন্যার পানি বাড়তে বাড়তে একসময় মানুষ ঘরের চালে আশ্রয় নিত। কখনো পুরো ঘরই স্রোতে ভেসে যেত। ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায়, এমন দৃশ্য বারবার ফিরে এসেছে।
নোয়াখালীর আদালতে এক সময় নাকি বিজ্ঞ আইনজীবীরা বিচারকের কাছে বলতেন, ‘‘মহামান্য আদালত, একটা লম্বা তারিখ দিন-সুদিনে।’’ প্রথমে মনে হতো, সুদিন বুঝি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সময়! পরে বুঝলাম, ‘‘সুদিন’’ মানে বর্ষা শেষ হওয়ার পর। কারণ বর্ষায় মক্কেলও আসে না, নৌকাও সময়মতো চলে না, আর কোর্টে পৌঁছানোও একপ্রকার দুঃসাধ্য কাজ। তবে বর্ষাকে পুরোপুরি দোষ দেওয়াও অন্যায়। এই বর্ষাই উজান থেকে উর্বর পলি এনে জমিকে নবজীবন দেয়। কৃষকের চোখে তখন সোনালি স্বপ্ন। আমন ধানের মৌসুম শুরু হয়। তাই বর্ষা একই সঙ্গে অভিশাপও, আবার আশীর্বাদও।
কিন্তু আধুনিক নগরসভ্যতা বর্ষাকে নতুন এক পরিচয় দিয়েছে, জলাবদ্ধতা উৎসব। আগে বৃষ্টির পানি নদীতে যেত। এখন নদীর পথ দখল হয়েছে, খাল ভরাট হয়েছে, নালা পলিথিনে ভর্তি, ড্রেন প্লাস্টিক বোতল আর চিপসের প্যাকেটে অবরুদ্ধ। ফলে আকাশ থেকে এক ঘণ্টা বৃষ্টি নামলেই শহর ঘোষণা করে-‘‘পাহাড়ের প্রাদেশ থেকে সরে পড়–ন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে নিরাপদ আশ্রয় চলে যান।’’
আর একটা মজার বিষয় হল বর্ষাকালে চট্টগ্রাম নগরীতে রাস্তা আর খালের মধ্যে কোন তফাৎ থাকে না। কোথায় ড্রেন, কোথায় রাস্তা-সবই পানিতে থৈ থৈ, একাকার। রিকশা চলে নৌকার মতো, মোটরসাইকেল চলে সাবমেরিনের মতো, আর পথচারীরা হাঁটে এমনভাবে যেন তাঁরা অলিম্পিকের জলক্রীড়া প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনেকদিনের নগরের বসবাসকারী জেলে তার তরঙ্গ বেটা খুলে পুরাতন জালটি বের করে রাস্তায় জাল মারে। কলা গাছ যেখানে পাওয়া যায় কিশোররা কলা গাছ কেটে ভেলা বানিয়ে মজা করে।
এই সময়েই আমাদের শিক্ষা বোর্ডের মাথায় আসে একটি অসাধারণ পরিকল্পনা এইচএসসি পরীক্ষা! মনে হয়, পরীক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবহারিক পরীক্ষাও নেওয়া হচ্ছে।
পরীক্ষার্থীর জন্য সম্ভাব্য নির্দেশনা হতে পারে-প্রবেশপত্রের সঙ্গে একটি জলরোধী ব্যাগ আনতে হবে। কলমের পাশাপাশি একটি ছোট ছাতা, গামবুট ও লাইফ জ্যাকেট রাখা বাঞ্ছনীয়। পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে সাঁতার জানা অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে গণ্য হবে। উত্তরপত্র ভিজে গেলে নম্বর কাটা হবে না, যদি কালি পুরোপুরি ধুয়ে না যায়!
পরীক্ষার্থী সকাল সাতটায় বের হয়েছে। পথে হাঁটুসমান পানি। কোথাও কোমর সমান। রিকশাওয়ালা বলছেন, ‘‘ভাই, এই পর্যন্তই যেতে পারব। এরপর থেকে স্পিডবোট লাগবে।’’ কোনোমতে ভিজে একাকার হয়ে কেন্দ্রে পৌঁছে দেখে জুতা এক রুমে, মোজা আরেক রুমে, আর পরীক্ষার্থী নিজে সম্পূর্ণ অন্য রূপে!
এদিকে প্রতিদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় জলাবদ্ধতার ছবি। কোথাও অ্যাম্বুলেন্স আটকে আছে, কোথাও স্কুলে যাওয়ার জন্য শিশুদের নৌকায় উঠতে হচ্ছে, কোথাও আবার মানুষ খোলা ম্যানহোলে পড়ে যাচ্ছে। তারপরও বর্ষা এলেই আমরা আবার নতুন করে রচনা লিখি ‘‘বর্ষা আমাদের প্রিয় ঋতু।’’ প্রিয় তো বটেই! বিশেষ করে যারা দ্বিতীয় তলার বারান্দা থেকে বৃষ্টি দেখে চা খায়, তাদের কাছে।
আসলে সমস্যাটা বর্ষা নয়। সমস্যা আমাদের। আমরা জলাভ‚মি ভরাট করি, খাল দখল করি, ড্রেনে ময়লা ফেলি, প্লাস্টিক যেখানে-সেখানে ছুড়ে দিই। তারপর পানি নামতে না পেরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। শেষে আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলি, ‘‘এত বৃষ্টি হলো কেন?’’
বর্ষা তো হাজার বছর ধরেই আসে। বদলেছি আমরা। তবে একটি প্রশ্ন এখনো মাথায় ঘুরপাক খায়- দেশে যখন প্রতিবছর বর্ষাকালে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা আর যানজটের মৌসুম থাকে, তখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাটিও ঠিক এই সময়েই নেওয়ার এমন অদম্য আগ্রহ কেন?
হয়তো একদিন প্রশ্নপত্রে নতুন একটি ব্যবহারিক প্রশ্ন থাকবে; ‘‘জলাবদ্ধ রাস্তায় প্রবেশপত্র শুকনা রেখে নিরাপদে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর কৌশল বর্ণনা কর।’’ যে পরীক্ষার্থী সফলভাবে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবে, তাকে অতিরিক্ত ২০ নম্বর দেওয়া যেতে পারে। কারণ সে ইতোমধ্যেই জীবনের সবচেয়ে কঠিন ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে!
লেখক: অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত)
পূর্বকোণ/নুসরাত












