ভোলার বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ। জীবন ভেলায় ভাসতে ভাসতে ঠাঁয় নেন লালখান বাজারে। পাহাড় পাদদেশে। স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার জীবন সংসার। রিকশা চালিয়ে জীবনযাপন করেন। নগরের লালখান বাজার, টাইগারপাস, জিইসি ও ২ নম্বর গেট এলাকার আশপাশে রিকশা চালান তিনি।
নূর মোহাম্মদ বললেন, ‘১০-১২ বছর ধরে লালখান বাজারের মতিঝর্ণা এলাকায় থাকি। সেমিপাকা ঘর। কম টাকায় পানি ও বিদ্যুৎ পাই| আমাদের মতো লোকজনের বসবাসের জন্য এরচেয়ে ভালো জায়গা আর কোথাও নেই।’ গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগে ঘরে ফিরে যেতে চান নূর মোহাম্মদ। কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘রাস্তায় লোকজন কম। ভাড়া নেই। আর ঘরে বউ-বাচ্চারা ভয়ে থাকবে।’ তার বড় ছেলে চতুর্থ ও মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। দিন দিন খরচ বাড়ছে। রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।
এই আক্ষেপ শুধু রিকশাচালক নূর মোহাম্মদের নয়। পাহাড় পাদদেশে এভাবে মৃত্যু-ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারী শত শত মানুষের। ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের বেশির ভাগের অভিমত, কম টাকা সব ধরনের নাগরিক সুবিধা মিলে পাহাড়ে। তাই কম আয়ের লোকজন ঝুঁকি মাথায় নিয়ে বাধ্য হয়ে পাহাড় পাদদেশে বসবাস করেন।
জেলা প্রশাসনের ২০২৩ সালের হিসাব মতে, নগরীতে ১৬টি পাহাড়ে ৬১৭৫টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। তবে বাস্তবে এরচেয়ে কয়েক গুণ বেশি মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
গত কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসন সোমবার থেকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে। মাইকিং করে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে আসার জন্য মাইকিং করে যাচ্ছে। কিন্তু সাড়া দিচ্ছে না ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীরা। গত বছরও পাহাড়ধসের শঙ্কায় নিরাপদ আশ্রয়ে ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল জেলা প্রশাসন।
গতকাল মঙ্গলবার জেলা প্রশাসনের আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগের রাতে ২৫ থেকে ২৬টি পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে আসার পরও তারা আবার নিজেদের ঘরে ফিরে গিয়েছিল। পাহাড়ধসের বড় দুর্ঘটনাগুলো সাধারণত গভীর রাতে ঘটে। মানুষ তখন ঘুমিয়ে থাকে। বের হওয়ার সুযোগও পায় না। তাই কোনো অবস্থাতেই ঝুঁকি নিয়ে ঘরে ফিরে যাবেন না।’
বৃষ্টি হলেই তোড়জোড় :
বৃষ্টি হলেই পাহাড় পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার তোড়জোড় করে জেলা প্রশাসন। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি সংস্থার পাহাড় মালিকেরা আরাম-আয়েশে থাকেন।
গতকাল মঙ্গলবার পাঁচলাইশ থানার রহমাননগর এলাকায় দেয়ালধসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় শিশুসহ আহত হয়েছেন আরও দুজন। তারা সবাই একই পরিবারের সদস্য। কাপ্তাইয়ে মারা যান দুই শিশু। আগের তিন সোমবার কক্সবাজারে পাহাড়ধসে নারী-শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনার পর চট্টগ্রামেও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েছে।
বর্ষাকাল আসলে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি দু-একটি সভা করে। সভায় পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাহাড় সুরক্ষায় নানা সিদ্ধান্ত হয়। অনেক তোড়জোড় দেখা যায়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। পাহাড় মালিক রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম ওয়াসা, গণপূর্ত, জাতীয় গৃহায়ণ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ-এসব প্রতিষ্ঠানের কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙে না।
বর্ষা আসলে প্রশাসনের তোড়জোড় ও পাহাড় থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিদের সরিয়ে আনাকে লোক দেখানো বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী। তিনি বলেন, ২০০৭ সাল থেকে ধারাবারিকভাবে পাহাড় কাটা, পাহাড়ধস, স্থাপনা নির্মাণে বিপর্যয় চলে আসলেও প্রশাসন একেবারেই নির্লিপ্ত। রাজনীতিবিদেরা জড়িত থাকায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
কেন মৃত্যুকূপ বসবাস :
কম টাকায় বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগসহ নাগরিক সব ধরনের সুবিধা থাকায় পাহাড় পাদদেশে মৃত্যুকে সঙ্গে নিয়ে বসবাস করে আসছেন নিম্ন আয়ের লোকজন। মধ্যবিত্ত অনেকেই পাকা ও দালান নির্মাণ করে বসবাস এবং ভাড়া দিয়ে আসছেন। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় দখলে জড়িত| রয়েছে সরকারি-বেসরকারি বড় প্রতিষ্ঠানও। পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন, কাঁচা-পাকা দালান ও বস্তিঘর। এসব অবৈধ স্থাপনা রয়েছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা| তাই কম খরচে মধ্য-নিম্নবিত্ত মানুষ মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করে আসছে পাহাড় পাদদেশে।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত কাগজে-বন্দী:
২০১২ সালে অনুষ্ঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ১০ম সভা থেকে সর্বশেষ ৩১তম সভা পর্যন্ত কমিটির ১৪টি সভার কার্যবিরবণী পর্যালোচনা করা হয়। প্রতিটি সভায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
কমিটির সর্বশেষ ৩১তম সভায় এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ২৬তম সভায় নগরীর ২৬টি পাহাড়ে ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার অবৈধ বসবাসকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এরমধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার ১৬টি পাহাড়ে রয়েছে ৬১৭৫টি পরিবার। ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০ পাহাড়ে রয়েছে ৩৮৩টি পরিবার।
পূর্বকোণ/আদর













