চট্টগ্রাম সোমবার, ০৬ জুলাই, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

প্রচারে গা ভাসালেন ‘শিক্ষকরাও’

হারিয়ে যাচ্ছে পেশার মর্যাদা

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

৬ জুলাই, ২০২৬ | ৪:৪৭ পূর্বাহ্ণ

নগরের দেয়াল, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ফুটওভারব্রিজ কিংবা সড়ক বিভাজকে পোস্টারের ছড়াছড়ি নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি নতুন প্রবণতা উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনে শিক্ষকদের বিশাল প্রতিকৃতি, নামের আগে-পিছে নানা বিশেষণ, শতভাগ সাফল্যের দাবি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারণা এখন যেন একটি অলিখিত প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। এদের মধ্যে একটা বড় অংশ প্রথাগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন, এমন নয়। তারা শুধুই কোচিং সেন্টারে পড়ান। শিক্ষাকে তারা ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করেন। যে কারণে সেখানে নীতি-নৈতিকতা থাকে না বললেই চলে। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য যত ধরনের প্রচার-প্রচারণা আছে, সর্বোচ্চ কৌশলই তাঁরা প্রয়োগ করেন।

 

গত শনিবার (৪ জুলাই) দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রধান সংবাদে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। সংবাদটি শুধু নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার কথা বলে না; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক অবক্ষয়ের এক গভীর চিত্রও তুলে ধরে।

 

শিক্ষকতা এমন একটি পেশা, যার ভিত্তি জ্ঞান, সততা, সংযম এবং আত্মমর্যাদা। চিকিৎসক যেমন রোগীর বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করেন, বিচারক যেমন নিরপেক্ষতার প্রতীক, তেমনি শিক্ষকও সমাজের নৈতিক পথপ্রদর্শক। সেই শিক্ষক যখন নিজের বিশাল ছবি টাঙিয়ে শিক্ষার্থী আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় নামেন, তখন তিনি অজান্তেই নিজের পেশাগত মর্যাদাকেই বাজারজাত করেন।

 

একসময় শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে চিনতো তাঁর শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, গবেষণা, মানবিকতা ও আদর্শের জন্য। এখন অনেক ক্ষেত্রেই একজন শিক্ষককে চেনানো হচ্ছে তাঁর পোস্টারের আকার, ব্যানারের সংখ্যা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীর হিসাব দিয়ে। শিক্ষাকে ধীরে ধীরে পণ্যে এবং শিক্ষককে ব্র্যান্ডে পরিণত করার এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ সামাজিক প্রভাব ফেলবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো স্বার্থের সংঘাত।

শিক্ষক যদি একই সঙ্গে বিদ্যালয় বা কলেজে পাঠদান করেন এবং বাইরে নিজের নামে কোচিং চালান, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই- তিনি কী শ্রেণিকক্ষে তাঁর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিচ্ছেন, নাকি শিক্ষার্থীদের কোচিংমুখী হওয়ার জন্য একটি অদৃশ্য চাপ তৈরি হচ্ছে? এ প্রশ্ন শুধু অভিভাবকদের নয়; এটি রাষ্ট্রেরও বিবেচনার বিষয়। কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনে শিক্ষকদের যে ভাষায় উপস্থাপন করা হয়, তা অনেক সময় ‘লোভনীয় অফারের মতো’।

 

‘দেশসেরা শিক্ষক’, ‘বোর্ডের সর্বোচ্চ ফলের নিশ্চয়তা’, ‘ভর্তির শেষ ভরসা’- এ ধরনের দাবি শুধু বিজ্ঞাপনী অতিরঞ্জন নয়; এগুলো শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপও বাড়ায়। শিক্ষা তখন আর জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া থাকে না; হয়ে ওঠে নম্বর সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। নগরের নান্দনিকতাও এই অনিয়ন্ত্রিত পোস্টার সংস্কৃতির কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশন নিয়মিত পোস্টার অপসারণে অভিযান চালালেও কয়েক দিনের মধ্যে আবার একই দৃশ্য ফিরে আসে। কারণ সমস্যার মূল কেবল পোস্টার নয়; এর পেছনে রয়েছে দায়মুক্তির সংস্কৃতি। আইন প্রয়োগ যদি নির্বাচিতভাবে হয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে কোনো অভিযানই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।

 

অভিভাবকদেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বড় ছবি, চটকদার স্লোগান কিংবা শতভাগ সাফল্যের প্রতিশ্রুতিতে বিভ্রান্ত না হয়ে শিক্ষকের প্রকৃত যোগ্যতা, পাঠদানের মান এবং মানবিক মূল্যবোধকে মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষক যদি বাজারের প্রতিযোগিতায় নিজেকে একটি বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত করেন, তবে ক্ষতি শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার নয়; ক্ষতি হবে পুরো সমাজের। শিক্ষককে আবারও জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে শিক্ষাকে ব্যবসার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। শিক্ষকতাকেও ব্যক্তিগত প্রচারণার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

 

শিক্ষকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর বিশাল পোস্টারে নয়, তাঁর বিনয়, প্রজ্ঞা, সততা এবং শিক্ষার্থীর জীবনে রেখে যাওয়া স্থায়ী আলোকচিহ্নে। এই সত্য যত দ্রুত আমরা উপলব্ধি করব, ততই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সমাজ উভয়ই উপকৃত হবে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট