টাঙ্গুয়ার হাওর- সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ জলরাশি, দূরের মেঘালয় পাহাড়, ডুবে থাকা গাছপালা আর আকাশ-জলের অপূর্ব মেলবন্ধন। প্রকৃতির এই বিশাল নিঃশব্দ সৌন্দর্যের মাঝেই ৯ থেকে ১২ আগস্ট জাহাজে কাটানো কয়েকটি দিন আমাদের সিএমসি-২০-এর জীবনে হয়ে রইল এক অসাধারণ স্মৃতি।
১৯৭৮ সালে যখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে প্রবেশ করেছি তখন আমরা ঝকঝকে তরুণ। তারপর প্রায় পেরিয়ে গেছে পঞ্চাশ বছর। জীবনের বিচিত্র পথ আমাদের নিয়ে গেছে নানা দিকে- পেশা, পরিবার, দায়িত্ব, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ-বেদনার অসংখ্য অধ্যায় শেষে আজ আমরা অনেকটাই অবসরে। সন্তানরা বড় হয়েছে; প্রকৃতির নিয়মে তারা এখন নিজেদের জীবন ও দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত। একসময় যারা ছিলো আমাদের প্রায় পুরো পৃথিবীজুড়ে আজ তাদেরও নিজস্ব পৃথিবী তৈরি হয়েছে। এই সময়টাতেই হয়তো পুরোনো বন্ধুদের সান্নিধ্য নতুন করে অনুভব করি। শত ব্যস্ততার মাঝেও হাওর ভ্রমণের ডাক আর উপেক্ষা করা গেল না। দিনক্ষণ ঠিক করে চেপে বসলাম; জাহাজের নাম এমভি টাঙ্গুয়ার হাওর, মাঝারি আকারের ক্রুজ শিপ। পরিবারসহ সব মিলিয়ে ৬৫ জন। গোধূলির ছায়া আর রাতের আঁধার ভেদ করে ছুটে চলা জাহাজ শীতলক্ষা মেঘনা হয়ে সকালে পৌঁছে গেলো কিশোরগঞ্জের নিকলির হাওর। জাহাজ থেকে নেমে অটোতে চড়ে ঘুরে এলাম দেশের সুন্দরতম ইটনা অষ্টগ্রাম অল ওয়েদার সড়ক। কেউ কেউ অষ্টগ্রামের বিখ্যাত পনির কিনে নিলো এক ফাঁকে। তারপর আবার পঙ্খীরাজ ভেসে চললো কিশোরগঞ্জ নেত্রকোনার ছোট নদী আর জলাভূমি দিয়ে টাঙ্গুয়ার পথে। রাত নেমে গেলে রাত্রি বিরতি হলো নির্ধারিত গজারিয়া লোকালয়ের পাশে; তখন হাওর দেখা দেয়নি ভোরের আলো ফুটতেই চোখের সামনে সমুদ্রের মত বিশাল জলরাশির শান্ত জলাধার, প্রকৃতির বিস্ময়। জাহাজ চলছে আর নিয়মিত বিরতিতে চলছে খাওয়া দাওয়া হরেক রকম মাছ মাংস, দেশি বিদেশি ফল চা কফি।
হাওরে গিয়ে মনে হলো- আমরা যেন বয়সটা তীরেই রেখে জাহাজে উঠেছিলাম। জাহাজের ভেতরে বসে আড্ডা, পুরোনো দিনের গল্প, একে অন্যকে নিয়ে খুনসুটি- কোথায় গেল এতগুলো বছর! হাওরের পানিতে নেমে সেই উচ্ছ্বাস ছিল আরও উন্মাদনার। কেউ সাঁতার কাটছে, কেউ ভাসছে, কেউ বন্ধুর ছবি তুলছে, কেউ আবার দূর থেকে উৎসাহ দিচ্ছে। হাসি আর চিৎকারে চারপাশ মুখর। স্বচ্ছ সবুজাভ জল, দূরে হিজল করচের সারি, আর তার মাঝে আমাদের সেই পুরোনো, প্রাণখোলা হাসি- এ যেন আমাদের পুনর্জন্ম। মনে হচ্ছিল, শরীরটা বর্তমানের, কিন্তু মনটা ঠিক তারুণ্য ভরা ১৯৭৮-এর! হাওরের জলে ধুয়ে গেল সময়ের সব ভার।
সন্ধ্যা নামতেই আনন্দ যেন অন্য মাত্রা পেলো। দিগন্তে সূর্য ডুবছে, হাওরের জল রঙিন হয়ে উঠছে, আর জাহাজের ডেকে গান, হাততালি, নাচ, হাসি-একসময় কে শিল্পী আর কে দর্শক শ্রোতা সেই পার্থক্যই আর থাকল না। যে যেখানে ছিলো সেখান থেকেই আনন্দে মিশে একাকার। কে- কেমন গাইলাম, কে- কেমন নাচলাম- সেসব নিয়ে ভাবার সময় কোথায়! বহুদিন পর আমরা যেন সব ব্যস্ততা আর বয়সের হিসাব ভুলে এতটা নির্ভার, স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণখুলে আনন্দে মেতে উঠেছিলাম। নৈশভোজের পর রাত জেগে র্যাফেল ড্র আর হাউজির উত্তেজনা ছিল সত্যিই দারুণ উপভোগ্য।
তার আগে বাউল শিল্পীর আধ্যাত্মিক গানের সুরে আমাদের মনও যেন মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল- হাওরের শান্ত প্রকৃতির মাঝে সেই মুহূর্তে তৈরি হয়েছিল এক অন্যরকম অপার্থিব আবেশ। আমাদের সেবায় নিয়োজিত জাহাজ কর্মীদের অসাধারণ বাদ্য- বাজনা সবাইকে চমকে দিয়েছিলো, মনে হয়েছে এরাই বুঝি গানের দলের নিয়মিত সদস্য। অসাধারণ সেই পরিবেশনা মুহূর্তেই তাঁরা আমাদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের অংশ হয়ে উঠলেন। তাঁদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ শুধু অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করেনি, ট্যুর অপারেটরের সুন্দর, আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ কর্মপরিবেশেরও পরিচয় দিয়েছে। পুরো সফরজুড়ে জাহাজের প্রায় কুড়িজন কর্মী তাদের আন্তরিকতা, আতিথেয়তা ও সহযোগিতা আমাদের মুগ্ধ করেছে।
মোবাইল ফোনে তোলা ছবিগুলোর দিকে তাকালে এখন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে হাসি- ৪৮ বছরের বন্ধুত্বের এক চিরচেনা ভাষা। বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকা, প্রাণখোলা অট্টহাসি, পাশাপাশি বসে গল্প করা- কোনোটাই ক্যামেরার জন্য তৈরি করা কৃত্রিম মুহূর্ত নয়। এগুলো ছিল বহু বছরের সম্পর্কের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। পুরোনো ভালোবাসা, দুষ্টুমি আর মান-অভিমান- তার সঙ্গে কোথাও কোথাও হয়তো নতুন করে আবিষ্কৃত ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের নতুন রং- সবমিলিয়ে সম্পর্কগুলো যেন আবার প্রাণ ফিরে পেলো। এই বয়সেও ছোটখাটো মান-অভিমান, আবদার-অভিযোগ এবং সেগুলো মিটিয়ে দেওয়ার সকলের প্রচেষ্টা বেশ উপভোগ করেছি। মান ভাঙানো আর সবাইকে আবার একসঙ্গে হাসিতে ফিরিয়ে আনার সেই দৃশ্যগুলো দেখে কখনো কখনো মনে হয়েছে, সময় যেন সত্যিই পেছনে ফিরে গেছে; আমরা আবার ১৯৭৮-এর সিএমসি-তে, সেই আগের আবেগপ্রবণ মানুষগুলোই!
এই সফরে আমাদের সিএমসি-২০ টি-শার্ট আর ক্যাপ যেন শুধু পোশাক ছিল না- ছিল আমাদের একাত্মতা, তারুণ্য আর বন্ধুত্বের প্রতীক। সবুজের সতেজতায় আমরা যেন আবার ফিরে পেয়েছিলাম অতীতের প্রাণচঞ্চল দিন। বয়সের ব্যবধান ভুলে একই রঙে যখন সবাই একসঙ্গে হলাম, মনে হলো- সময় আমাদের বয়স বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু সিএমসি-২০-এর চেতনাকে একটুও ম্লান করতে পারেনি। হাওরের নীল-সবুজ প্রকৃতির মাঝে আমাদের এই সবুজ দল যেন ঘোষণা করছিল- “We are still young at heart, we are still CMC-20!”
প্রয়াত বন্ধুদের আত্মার মাগফিরাত এবং অসুস্থ বন্ধুদের সুস্থতা কামনায় সম্মিলিত দোয়া আমাদের পুনর্মিলনে যোগ করেছিল এক গভীর আবেগ ও ভ্রাতৃত্বের অনুরণন। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মাঝেও বন্ধুদের স্মরণ করা এবং তাদের জন্য প্রার্থনা আমাদের পারস্পরিক বন্ধন, মমত্ববোধ এবং বন্ধুত্বের প্রতি আজীবন অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।
তবে এত আনন্দের মাঝেও ছিলো হরিষে বিস্বাদ। আমাদের এক বন্ধু ছোট একটা দুর্ঘটনার কারণে হঠাৎ উদ্বেগের ছায়া নেমে এসেছিল। সৌভাগ্যক্রমে আঘাত গুরুতর হয়নি। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা। ঘটনাটি আনন্দের মাঝেও আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে- জীবন কত অনিশ্চিত, আর প্রিয় মানুষগুলোর উপস্থিতি কত মূল্যবান। এই স্মরণীয় আয়োজনের জন্য আমাদের আয়োজকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। একটি ট্যুর আয়োজন করা যায় পরিকল্পনা দিয়ে, সেটি শুধু মস্তিষ্কের নয় হৃদয়েরও। এমন একটি পুনর্মিলন স্মরণীয় হয়ে ওঠে ভালোবাসা, শ্রম ও আন্তরিকতায়। আয়োজকরা সেটিই করতে সফল হয়েছেন।
শেষ কথা টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে আমরা শুধু কিছু ছবি বা ভিডিও নিয়ে ফিরিনি। সঙ্গে নিয়ে ফিরেছি আরও মূল্যবান কিছু- নিজেদের হারিয়ে যাওয়া একটি অংশ। সিএমসি-২০-এর সেই সব প্রিয় সহপাঠীর প্রতি হৃদয়ের গভীর থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ, যারা শত ব্যস্ততা, দূরত্ব ও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের এই সফরে যোগ দিয়েছে। তাদের প্রত্যেকের উপস্থিতিই এই পুনর্মিলনকে প্রাণ দিয়েছে, আনন্দকে পূর্ণতা দিয়েছে এবং সাধারণ দিনকে পরিণত করেছে জীবনের অসাধারণ কিছু স্মরণীয় মুহূর্তে। তোমরা এসেছিলে বলেই আমরা আবার একসঙ্গে হেসেছি, গেয়েছি, নেচেছি, মান-অভিমান করেছি এবং কিছুক্ষণের জন্য ফিরে গিয়েছি আমাদের প্রিয় ১৯৭৮-এ।
হাওরের জল একসময় শান্ত হয়ে যাবে। জাহাজ অন্য যাত্রী নিয়ে আবার ছুটে চলবে। আমরাও ফিরব আমাদের দৈনন্দিনতায়। কিন্তু ৯-১২ আগস্টের এই কয়েকটি দিন আমাদের স্মৃতিতে থেকে যাবে অন্যরকম এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে।
সিএমসি-২০ কেবল একটি ব্যাচের পরিচিতি নয় বরং আমাদের স্মৃতির ভাণ্ডার। আর জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো এক বন্ধুত্বের নাম।
তাই বিদায়ের সময় মনে হয়েছে- এটা শেষ নয়।
আবার দেখা হবে, বন্ধুরা।
বয়স আরও বাড়ুক, চুল আরও সাদা হোক-
কিন্তু আমাদের ভেতরের ২০ তম মেডিক্যাল ব্যাচ যেন কখনো বুড়ো না হয়।
লেখক: চেয়ারম্যান পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সার্জারি একাডেমিয়া ও সিএমসি-২০ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী
















