চট্টগ্রাম শনিবার, ০৪ জুলাই, ২০২৬

প্রয়োজন সমন্বিত ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার

চট্টগ্রামের রোগীদের আর কত অপেক্ষা!

ডা. খন্দকার এ কে আজাদ

৪ জুলাই, ২০২৬ | ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে ক্যান্সার আজ একটি নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। এরচেয়েও উদ্বেগের বিষয় হল, দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা সর্বাধিক হলেও আধুনিক ও সমন্বিত ক্যান্সার চিকিৎসা অবকাঠামো এখনো অত্যন্ত সীমিত। প্রতিদিন একজন সার্জন হিসেবে আমরা যে মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হই, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
ক্যান্সার চিকিৎসার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো রেডিওথেরাপি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে প্রায় ৭০ শতাংশ ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসার কোনো না কোনো পর্যায়ে রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম বিভাগের চাহিদার তুলনায় পরিস্থিতি অত্যন্ত হতাশাজনক। যেখানে প্রয়োজন প্রায় ৪১টি রেডিওথেরাপি ইউনিট, সেখানে কার্যকরভাবে বিদ্যমান রয়েছে মাত্র ৩টি। এই বিশাল ঘাটতির কারণে অসংখ্য রোগী বাধ্য হয়ে ঢাকায় অথবা দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য ছুটে যাচ্ছেন।

 

এর ফলাফল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসা শুরু হতে বিলম্ব হচ্ছে। অনেক পরিবার সর্বস্ব বিক্রি করেও চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পারছে না। আবার অনেক রোগী পর্যাপ্ত চিকিৎসা সম্পন্ন করার আগেই রোগের অগ্রগতির কাছে পরাজিত হচ্ছেন।

 

সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের রেডিওথেরাপি সংকট নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেসব তথ্যে দেখা যাচ্ছে, অনেক রোগীকে রেডিওথেরাপির জন্য এক বছর বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে অনেকের রোগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে চিকিৎসা পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন বিশেষজ্ঞগণ। কখনো কখনো তুলনামূলক কম কার্যকর বিকল্প পদ্ধতি বেছে নিতে হয়। এটি শুধু একটি চিকিৎসাগত সমস্যা নয়; এটি রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা, জীবনমান এবং পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত।

 

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, চট্টগ্রামে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত ক্যান্সার কেয়ার ইউনিট গড়ে ওঠেনি। আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসায় মাল্টিডিসিপ্লিনারি পদ্ধতি- যেখানে সার্জন, মেডিকেল অনকোলজিস্ট, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট, প্যাথোলজিস্ট এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞগণ একসঙ্গে রোগীর জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করেন- সেটিই আন্তর্জাতিক মানদ-। কিন্তু চট্টগ্রামে এই সুবিধা এখনও একেবারেই সীমিত।

 

দুঃখজনক হল- ঢাকা ও চট্টগ্রামের চিকিৎসা সক্ষমতার ব্যবধান দিন দিন বেড়েই চলেছে। চট্টগ্রাম থেকে বিপুলসংখ্যক রোগী ঢাকায় যেতে বাধ্য হওয়ায় রাজধানীর ক্যান্সার কেন্দ্রগুলো পড়ছে অতিরিক্ত চাপের মুখে। এর প্রভাব শুধু ঢাকার রোগীদের ওপর নয়; সারা দেশের ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। এর জন্য প্রয়োজন নিবেদিতপ্রাণ অনকোলজি টিম, আধুনিক অবকাঠামো, পর্যাপ্ত রেডিওথেরাপি সুবিধা, উন্নত যন্ত্রপাতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

 

বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমুখী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি- বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে চট্টগ্রামে একটি সমন্বিত ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলা সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগ শুধু চট্টগ্রামের মানুষের দুর্ভোগ কমাবে না বরং জাতীয় পর্যায়েও ক্যান্সার চিকিৎসার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ক্যান্সার রোগীদের স্বার্থে অত্যাবশ্যকীয় এই উদ্যোগটি নেয়ার সময় কিন্তু এখনই। বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামের হওয়ায় চট্টগ্রামবাসী আশা করছেন মন্ত্রী ক্যান্সার চিকিৎসায় চট্টগ্রামের বেহাল বাস্তবতা উপলব্ধি করে অনতিবিলম্বে বহুল প্রত্যাশিত একটি উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। ক্রমবর্ধমান ক্যান্সার রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও আন্তরিক উদ্যোগে যদি একটি আধুনিক সমন্বিত ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তবে লাখ লাখ মানুষের জীবনমান বদলে যাবে।

 

চট্টগ্রাম বর্তমানে একটি নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। সরকারের পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ফ্রি ইকোনমিক জোন ঘোষণার উদ্যোগ এবং বৃহৎ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা চলমান। কিন্তু আধুনিক বিনিয়োগ পরিবেশ কেবল শিল্প অবকাঠামোর উপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উপরও। কোনো আন্তর্জাতিক বা জাতীয় বিনিয়োগকারী যখন একটি অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারী, দক্ষ জনবল এবং পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা নিরাপত্তাকেও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে। চট্টগ্রামে একটি আন্তর্জাতিক মানের সমন্বিত ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। তারা নিশ্চিত হতে পারবেন যে তাদের কর্মী ও পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজন হলে নিজ অঞ্চলেই উন্নত ক্যান্সার চিকিৎসা, রেডিওথেরাপি এবং সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। ফলে একটি আধুনিক ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার শুধু স্বাস্থ্যখাতের বিনিয়োগ নয়, বরং চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্যও একটি কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে কাজ করবে। তাই ফ্রি ইকোনমিক জোনের বিকাশ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা- এই দুটি উদ্যোগকে পরস্পর পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

 

এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনেরও ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন একজন চিকিৎসক হওয়ায় তিনি ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের গুরুত্ব গভীরভাবে অনুধাবন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে গত দুই বছর ধরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং ক্যান্সারকেন্দ্রিক একাডেমিক প্ল্যাটফর্মের যৌথ উদ্যোগে নগরবাসীর মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে স্তন ক্যান্সার ও কোলোরেক্টাল ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক স্ক্রিনিং কার্যক্রমে এই অংশীদারিত্ব নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

 

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নগরব্যাপী ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতা মাস (পিঙ্ক অক্টোবর) এবং কোলারেক্টাল ক্যান্সার সচেতনতা মাস উদযাপন, গণসচেতনতামূলক কর্মসূচি, স্ক্রিনিং কার্যক্রম এবং বহুপক্ষীয় অংশীদারিত্বভিত্তিক উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে স্থানীয় সরকার, চিকিৎসক সমাজ এবং একাডেমিক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। এই অগ্রযাত্রা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে; এখন প্রয়োজন এর মূল দর্শন ও গতি ধরে রেখে আরও বিস্তৃত পরিসরে এগিয়ে যাওয়া।
এই বাস্তবতার মধ্যে একটি আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রামের একটি ক্যান্সারকেন্দ্রিক একাডেমিক প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে পরিচালিত সাপ্তাহিক হাইব্রিড মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ড। প্রতি সপ্তাহে অনলাইন ও অফলাইনে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ একত্রিত হয়ে ক্যান্সার রোগীদের জন্য প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন করছেন। সীমিত পরিসরে পরিচালিত হলেও এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে চট্টগ্রামেও সমন্বিত ক্যান্সার চিকিৎসার সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব।

 

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল হাসপাতাল নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সূচনা হয় সচেতনতা, প্রতিরোধ এবং সময়মতো রোগ শনাক্তকরণের মাধ্যমে। সেই কারণেই চট্টগ্রামে চলমান এই উদ্যোগগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত ক্যান্সার কেয়ার ইকোসিস্টেম-এ রূপান্তর করা সময়ের দাবি। যদি স্থানীয় সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার, বেসরকারি খাত এবং নাগরিক সমাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসে তবে চট্টগ্রাম শুধু নিজের জনগণের জন্য নয়, সারা দেশের জন্য ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসার একটি অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে উঠতে পারে।
একজন সার্জন হিসেবে আমরা প্রতিদিন রোগীর কষ্ট, চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং অসহায় পরিবারের আর্তনাদ প্রত্যক্ষ করি। আমাদের বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে এই চিত্র পরিবর্তন করা সম্ভব।

 

আজ যদি চট্টগ্রাম সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারে তবে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই নগরী দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের একটি আঞ্চলিক ক্যান্সার চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তখন আর ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার জন্য শত শত কিলোমিটার দূরে ছুটতে হবে না; বরং তারা নিজেদের শহরেই আন্তর্জাতিক মানের সেবা পাবেন।
ক্যান্সার কারো জন্য অপেক্ষা করে না। আমাদেরও সিদ্ধান্তও গ্রহণে তাই আর অপেক্ষা করা উচিত হবে না।

 

লেখক: প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সার্জারি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট