কদিন আগেই কেটে গেলো ঈদের উচ্ছ্বাস। নববর্ষের রঙিন আবেশ এখনো তাজা। এই সময়ে বাংলার ঘরে ঘরে ছিলো হাসি, রান্নাঘরে ছিলো উৎসবের গন্ধ। কিন্তু খুব দ্রুতই সেই আনন্দ যেন ফিকে হয়ে আসছে। প্রকৃতিতে এখন বৈশাখের তীব্র তাপদাহ। ক্লান্তিকর, দমবন্ধ করা গরমে চারিদিকে হাঁসফাঁস অবস্থা। তবে এই উত্তাপ শুধু আবহাওয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই-ছড়িয়ে পড়েছে বাজারে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, সংসারের প্রতিটি হিসেব-নিকেশে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে যাতায়াতের ভাড়া। গ্যাসের দাম দফায় দফায় বাড়ায় উনুন জ্বালানোই এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় সবজিও হয়ে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। তীব্র লোডশেডিংয়ে এমনিতেই বিপর্যস্ত জনজীবন, তার ওপর আসছে বিদ্যুতের দাম বাড়ার বাড়তি চাপ। সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ, তাই মাছের বাজারেও আগুন। মুরগি-ডিমের দামও ঊর্ধ্বমুখী। ভোজ্যতেলের দামও বাড়ছে, মিলছেও কম। সবমিলিয়ে, মানুষের জীবনে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য চাপ-যেখানে প্রতিটি দিনই হয়ে উঠছে হিসেবের, বেঁচে থাকার, টিকে থাকার লড়াই।
চারদিকে দামের আঁচ: বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের প্রভাবে দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছছে। এখন প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রোলের দাম ১৩৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরই অনেক জায়গায় পুনর্নির্ধাণের আগেই বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ওঠেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তারমাথা থেকে আমতল পর্যন্ত চলাচল করা চট্টমেট্রো-১১০২০০ নম্বরের একটি টেম্পোর চালক উঠানামা ৫ টাকার জায়গায় ১০টাকা করে আদায় করছেন। এ নিয়ে যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে, ওই চালক উল্টো হুমকি দেন। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বাস-মিনিবাসেও।
এদিকে এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে। বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দাাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকায়। তবে বাস্তবে বাজার থেকে এটি আরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড়ও শুরু হয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব তৈরি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচও বেড়েছ উল্লেখযোগ্যভাবে। চট্টগ্রামের বাজারে সবজি সরবরাহ হয় নগরের বৃহত্তর সবজির আড়ত রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে। আড়তদারেরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামে অধিকাংশ সবজি আসে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটাতে চট্টগ্রামের আশপাশের উপজেলা থেকেও সবজির সরবরাহ করা হয়।
রিয়াজউদ্দিন বাজার আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারুক শিবলী পূর্বকোণকে বলেন, ‘বাজারে প্রতিদিন উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ থেকে গড়ে ৬০-৭০টি ট্রাক সবজি নিয়ে আসে। গত সোমবার থেকে পরিবহন বাড়া অনেক বেড়েছে। কুমিল্লা থেকে যেসব ট্রাক আসে সেগুলোতে ভাড়া দেড় হাজার পর্যন্ত বেড়েছে। আর যশোর-খুলনা-মেহেরপুর অঞ্চল থেকে আসা বড় ট্রাকগুলোতে ভাড়া ৮ থেকে ১০হাজার টাকা বেড়ে ৩০-৩২ হাজার থেকে ৪০ হাজারে পৌঁছেছে। ভাড়া বাড়ায় স্বাভাবিকভাবে সবজির দামও অনেক বেড়েছে।’
গত ১৫ এপ্রিল থেকে সমুদ্রে মাছ ধরায় ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। এ কারণে বাজারে সামুদ্রিক মাছ মিলছে কম। ফলে নদী ও চাষের মাছের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। প্রায় প্রতি মাছেই কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
ঈদের পর মুরগি ও ডিম-দুটিরই দাম কমে গিয়েছিল অনেকটাই। কিন্তু দুই সপ্তাহ ধরে আবারও মুরগি-ডিমের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এখন ব্রয়লার মুরগি ১৮৫-১৯০ ও ডিম ১২০-১৩০টাকা ছুঁয়েছে। মাছ-মুরগি-সবজি রাধার অন্যতম প্রধান জিনিস ভোজ্যতেলের দামও বাড়ছে ক্রমেই। শুধু বাড়ছেই না, বাজারে ভোজ্যতেল মিলছেও কম। এছাড়া অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার দিকে তো আছেই।
আমরা খাবো কি?: শুক্রবারের ভর দুপুরে বহদ্দারহাট মোড়ে কথা হয় রিকশাচালক জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। পুরো শরীর ঘামে ভেজা। বাজারের কথা তুলতেই যেন গলা শুকিয়ে এলো পঞ্চাশোর্ধ মানুষটির। গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘মামা, বাজারে ঢোকাই তো আমাদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। যেটাতে হাত দিই সেটাই বেশি দাম। আমরা গরিবেরা খাবো কি?’
শুধু নিম্নবিত্ত নয়-কষ্টে আছে মধ্যবিত্তও। চকবাজার থেকে সবজি আর মুরগি কিনে বাসায় ফিরছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শামসুল ইসলাম। তিনি আক্ষেপ করে পূর্বকোণকে বলেন, ‘সবকিছুরই দাম বাড়ছে। শুধু বেতনটা ছাড়া। যে বেতনটা পাই সেটি নিয়ে কোনোমতে সংসার চালাই। এখন মাসে গড়ে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি খরচ বাড়ছে। কিন্তু আয় তো আগের মতোই।’
গরিব মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার দিনে দিনে কমে আসছে বলে মন্তব্য করেছেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘প্রশাসনেরও বাজার তদারকি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ দেখছি না। এর ফলে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেই। যেমন ইচ্ছে তেমন করে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। মজুত করে কৃত্রিম সংকটও তৈরি করেছে।’
এমন পরিস্থিতিতে ভোজ্যতেলের অবৈধ মজুত প্রতিরোধ এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। প্রয়োজনে ভোজ্যতেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণে ‘ট্রাক সেল’ কার্যক্রম চালুর কথাও বলেছেন তিনি।
তবে শুধু ভোজ্যতেল নয়, কাঁচাবাজার থেকে পরিবহন, সবখানেই কার্যকর নজরদারি চায় মানুষ। কেননা সবার একটাই প্রত্যাশা-‘স্বস্তির বাজার, স্বাভাবিক জীবন।’
পূর্বকোণ/ইবনুর





















