উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসকে একসময় ‘শহরের রোগ’ বলা হলেও এখন তা গ্রামীণ জনপদেও মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগগুলো ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
দেশের উত্তরবঙ্গের দুই উপজেলার গ্রামীণ জনপদে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১ জন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন এবং প্রতি ১২ জনে ১ জন আক্রান্ত ডায়াবেটিসে। তবে সবচাইতে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেকই পরীক্ষার আগ পর্যন্ত জানতেন না যে তাদের শরীরে এই নীরব ঘাতক বাসা বেঁধেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে রোগ বহন করলেও তা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পাবনার চাটমোহর এবং দিনাজপুরের বিরল উপজেলায় ২ হাজার ৪৮৯ জন প্রাপ্তবয়স্কের উপর পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল স¤প্রতি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সাময়িকী ‘ক্লিনিক্যাল এপিডেমিওলজি অ্যান্ড গ্লোবাল হেলথ’-এ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের অল্টারনেটিভ অ্যাপ্রোচ ও অস্ট্রেলিয়ার সোশ্যাল হেল্প এন্ডেভার ফর বাংলাদেশ (সেবা) নামক দুটি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। ‘ওয়ান ডলার স্ক্রিনিং’ মডেলের এই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, জনপ্রতি মাত্র ১ ডলার খরচ করেই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই প্রাণঘাতী রোগগুলো সফলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব। গবেষকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এসব রোগের বড় অংশই উপসর্গহীন অবস্থায় ছিল, ফলে অনেকেই প্রথমবারের মতো স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমেই তাদের রোগ সম্পর্কে জানতে পারেন।
মেলবোর্ন প্রবাসী ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ও ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজের অনাবাসিক অধ্যাপক ডা. আহমেদ শরীফ শুভ’র নেতৃত্বে চলা গবেষণায় আরও যুক্ত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল ইসলাম, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. রেহেলী জিন্নাত, মেলবোর্ন প্রবাসী ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ডা. নাজমুল হক, অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. রোজলিন বটলেরো ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস’র অধ্যাপক ড. প্রদীপ সেন গুপ্ত।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২,৪৮৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশগ্রহণকারীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ পাওয়া গেছে ২০.৩ শতাংশের মধ্যে- অর্থাৎ প্রতি পাঁচ জনে প্রায় একজন। একই সঙ্গে ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়েছে ৮.৬ শতাংশ মানুষের মধ্যে, যা প্রতি ১২ জনে একজনেরও বেশি। গবেষকরা বলছেন, গ্রামের সাধারণ মানুষ বড় কোনো উপসর্গ না দেখা দিলে সাধারণত চিকিৎসকের কাছে যান না। ফলে রোগগুলো শরীরের ভেতরেই জটিল আকার ধারণ করছে। শনাক্ত হওয়া ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ৫৩ শতাংশের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, তাদের রোগটি ইতিমধ্যে জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। অথচ সচেতনতার অভাবে তারা ছিলেন পুরোপুরি উদাসীন।
গবেষকরা বলেন, এই দুই রোগ একই জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও সচেতনতার ঘাটতির কারণে একসাথে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস একসাথে থাকলে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
এই গবেষণার অন্যতম চমকপ্রদ দিক হলো এর খরচ। মাত্র ১ ডলার বা ১১০ টাকারও কম খরচে একজন মানুষের রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কিডনির প্রাথমিক পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। গবেষকরা জানান, এটি গ্রামীণ পর্যায়ে খুব কম খরচে পরিচালিত হয়েছে। প্রতি ব্যক্তির স্ক্রিনিং ব্যয় দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ টাকা। যা কম খরচে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি শনাক্তে সম্ভাবনাময় একটি পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে বড় পরিসরে এমন স্ক্রিনিং চালানো সম্ভব হলে আরও চিত্রে উঠে আসবে বলে মনে করেন গবেষকরা।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ডায়াবেটিস আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশের ক্ষেত্রে প্রস্রাবে গ্লুকোজ পাওয়া গেছে, অর্থাৎ অর্ধেকের চেয়ে বেশি রোগীর ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই জটিল পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। অথচ তারা আগে কোন চিকিৎসা গ্রহণতো দূরের কথা, রোগের কথাটিও জানতেন না। গবেষকরা মনে করছেন, এই অবস্থায় ভবিষ্যতে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
গবেষণায় স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার কিছু ক্ষতিকর দিকও উঠে এসেছে। বিশেষ করে পাবনা অঞ্চলে পাতে বাড়তি লবণ খাওয়ার প্রবণতা উচ্চ রক্তচাপের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, গ্রামীণ জনপদে ক্রমবর্ধমান শারীরিক স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের ঝুঁকি তৈরি করছে।
তবে আশার কথা হলো, শহরের তুলনায় গ্রামে কিডনি রোগের প্রকোপ (৩.৭ শতাংশ) তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে। গবেষণায় উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের হার পাওয়া গেছে মাত্র ৩.৭ শতাংশ, যা জাতীয় ও উপমহাদেশীয় পরিসংখ্যানের তুলনায় অভাবনীয়ভাবে কম। বাংলাদেশে ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে সাধারণত এই রোগের হার ১৭ থেকে ২৪ শতাংশ। মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের নিকটবর্তী নেপালের কিছু অংশেও কিডনি রোগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম (৫.১ শতাংশ) পাওয়া গিয়েছে। গবেষক দল মনে করছেন, ভৌগোলিক অবস্থান বা জীবনযাত্রার কোনো বিশেষত্বের কারণে এই দুই অঞ্চলে কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব কম হতে পারে। যা বোঝার জন্য আরও ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন।
প্রধান গবেষক ডা. আহমেদ শরীফ শুভ বলেন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীতে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস একসাথে যে হারে পাওয়া যাচ্ছে, তা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। তবে একই সঙ্গে এটি আশাব্যঞ্জক যে খুব কম খরচে- মাত্র ১ ডলারের কাছাকাছি ব্যয়ে এ ধরনের বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক রোগীই স্ক্রিনিংয়ের আগে জানতেন না যে তারা উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এটি প্রমাণ করে, প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়মিত স্ক্রিনিং না থাকলে রোগ নীরবে জটিল আকার ধারণ করে।
ডা. আহমেদ শরীফ শুভ আরও বলেন, এই ফলাফল স্বাস্থ্যনীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সুযোগও তৈরি করেছে। যদি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়মিত ও স্বল্প খরচের স্ক্রিনিং চালু করা যায়, তাহলে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি জটিলতার মতো বড় সমস্যাগুলো অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তিনি সতর্ক করে বলেন, তবে এটিকে সীমিত একটি গবেষণার ফল হিসেবে দেখতে হবে। আরও বড় পরিসরে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন, যাতে গ্রামীণ বাংলাদেশের প্রকৃত রোগচিত্র আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
গবেষকরা মনে করেন, এ ধরনের মডেল প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যুক্ত করা গেলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নীরবভাবে ছড়িয়ে থাকা রোগগুলো দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। কম খরচে স্ক্রিনিং চালু করলে গ্রামীণ পর্যায়ে আগেভাগে রোগ শনাক্ত করা সম্ভব, যা দীর্ঘমেয়াদে জটিলতা ও চিকিৎসা ব্যয় কমাতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছেন, এককালীন স্ক্রিনিং দিয়ে প্রকৃত রোগচিত্র পুরোপুরি বোঝা যায় না। তাই দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
পূর্বকোণ/এএইচ





















