অবশেষে চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (সিসিসিআই) ২০২৫-২০২৬ এবং ২০২৬-২০২৭ মেয়াদের নির্বাচনী তফসিল বাতিল ঘোষণা করেছে এফবিসিসিআই’র সালিশি ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে ‘বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২২’ ও ‘বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা, ২০২৫’ অনুসরণ করে দ্রæত নতুন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বুধবার এফবিসিসিআই সালিশি ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মিসেস নাসরিন বেগম এবং সদস্য ছায়েদ আহম্মদ ও এ.এস.এম. কামাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চূড়ান্ত আদেশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা ও বিরোধের অবসান ঘটল।
ট্রাইব্যুনালের আদেশে উল্লেখ করা হয়- চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনের জন্য গতবছরের ১১ আগস্ট ঘোষিত নির্বাচনী তফসিলটি আইনগত ও বিধিসম্মত ছিল না। এছাড়া ওই তফসিলটি ইতোমধ্যে সময়োত্তীর্ণ হয়ে পড়ায় তা বাতিল করা হয়েছে। রায় অনুযায়ী, নির্বাচন প্রক্রিয়া যাতে স্বচ্ছ ও সবপক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, তা নিশ্চিত করতে নতুন বিধি-বিধান অনুযায়ী পুনরায় তফসিল প্রণয়ন করতে হবে।
এর আগে চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচন সংক্রান্ত একটি সিভিল পিটিশন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন ছিল। সুপ্রিম কোর্টের চার সদস্যের পূর্ণাঙ্গ চেম্বার আদালত নির্দেশ দিয়েছিলেন, আগামী ২৬ এপ্রিলের মধ্যে এফবিসিসিআই’র বিরোধ নিষ্পত্তি ট্রাইব্যুনালকে চট্টগ্রাম চেম্বারের এই বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে। সেই সময়সীমার মধ্যেই ট্রাইব্যুনাল এই রায় প্রদান করল।
চট্টগ্রাম চেম্বারের এই নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকেই নানা ‘বিতর্ক’ চলছিল। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আটটি সংগঠনকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিলে এর বিরোধিতা করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন চট্টগ্রাম গার্মেন্টস এক্সেসরিজ গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল ও আরও দুজন ব্যবসায়ী। রিটকারীরা দাবি করেছিলেন, আগের নির্বাচনী তফসিলটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ঘোষিত হয়েছিল এবং বর্তমান গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে নির্বাচনের আয়োজন করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম চেম্বারের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সাধারণ শ্রেণি থেকে ১২ জন, সহযোগী শ্রেণি থেকে ৬ জন এবং টাউন এসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ শ্রেণি থেকে আরও ৬ জন পরিচালকসহ মোট ২৪ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। এই পরিচালনা পর্ষদই চিটাগাং চেম্বারের সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সহ-সভাপতি ঠিক করতেন। তবে নতুন বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা অনুযায়ী এখন ভোটারগণই তাদের প্রত্যক্ষ ভোটে সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সহ-সভাপতি নির্বাচিত করে নেতৃত্ব ঠিক করবেন।
এর আগে টাউন এসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ শ্রেণির ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে আদালত ও এফবিসিসিআইয়ে অভিযোগ জানানো হয়। বৈধ কাগজপত্র বিহীন এবং নামমাত্র সংগঠন দেখিয়ে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেন বলেও অভিযোগ ছিল। যা এই রায়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হলো।
ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করে, বিরোধপূর্ণ পক্ষগুলোকে একটি কার্যকর ও ফলদায়ক সিদ্ধান্ত প্রদান করা কেবল সংশ্লিষ্টদের জন্যই নয়, বরং চট্টগ্রাম চেম্বারের সকল সাধারণ সদস্যের স্বার্থ রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। রায়ে বলা হয়, বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালার ২১ বিধি অনুযায়ী একটি নতুন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে বর্তমানের সকল অস্পষ্টতা ও জটিলতা দূর করা সম্ভব।
নতুন এই প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও সদস্য পদের যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোম্পানি আইন-১৯৯৪ এবং আয়কর আইন ও বিধিমালার মতো প্রচলিত আইনগুলোর কঠোর প্রতিফলন থাকবে। এর ফলে সদস্যপদ নিবন্ধন ও কাগজপত্রের অসংগতি দূর হবে এবং সকল স্তরের ভোটার ও প্রার্থীদের আইনি অধিকার সমুন্নত থাকবে। ট্রাইব্যুনাল আরও জানায়, নতুন তফসিলের অধীনে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে পূর্বের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিভিন্ন অনিয়ম ও নথিপত্র সংক্রান্ত জটিলতারও একটি স্থায়ী ও আইনানুগ সমাধান নিশ্চিত হবে।
এফবিসিসিআই ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের প্যানেল লিডার এস. এম. নুরুল হক বলেন, ট্রইবুনাল অত্যন্ত বিচক্ষণ একটি রায় দিয়েছে। এজন্য তাদের সাধুবাদ জানাই। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের মনের আকাক্সক্ষা পূরণ হয়েছে। এখন সকলের অংশগ্রহণের একটি সুন্দর সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা রাখি।
পূর্বকোণ/ইবনুর





















