চট্টগ্রাম শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

বাঁধে বাঁকবদলের তোড়জোড়

সন্দ্বীপে ৫৬২ কোটি টাকার প্রকল্প

বাঁধে বাঁকবদলের তোড়জোড়

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

৭ নভেম্বর, ২০২৬ | ১২:৩৬ অপরাহ্ণ

দ্বীপকন্যা সন্দ্বীপের ৫৬২ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে ২০৫ কোটি টাকার কাজ পায় মেসার্স বিশ্বাস বিল্ডার্স। প্রতিষ্ঠানটির মালিক নজরুল ইসলাম (দুলাল) ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। পৌনে তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের কাজ করেছে নামেমাত্র। ২-৩ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির তিন অংশের কাজ বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

 

বিশ্বাস বিল্ডার্স ছাড়াও আওয়ামী লীগ ঘরানার আরেক ঠিকাদার মেসার্স ই-ইঞ্জিনিয়ারিং নামে আরেক প্রতিষ্ঠানের চার প্যাকেজের কাজ বাতিল করা হয়। এটি সাইফ পাওয়ার টেকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বলে জানান সংশ্লিষ্ট পাউবোর প্রকৌশলী। ই-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পে চারটি প্যাকেজে ১১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার কাজ পায়। প্রতিষ্ঠানটিও কাজ করেছে নামেমাত্র। দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ৭ প্যাকেজের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) খ ম জুলফিকার তারেক পূর্বকোণকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কাজ না করায় ৭ প্যাকেজের কাজ বাতিল করে নতুনভাবে দরপত্র আহ্বানকরা হয়েছে। যেসব ঠিকাদার এখনও কাজ শুরু করেনি বা কাজের অগ্রগতি খুবই কম পর্যায়ক্রমে সেসব ঠিকাদারের কাজ বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে।’

পাউবো সূত্র জানায়, প্রকল্পে ২০৫ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজ পায় মেসার্স বিশ্বাস বিল্ডার্স। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান বিশ্বাস বিল্ডার্সের মালিক নজরুল ইসলাম (দুলাল)। এরপর ওই প্রতিষ্ঠানের কাজে আর অগ্রগতি নেই। সন্দ্বীপ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে বেশি কাজ পায় বিশ্বাস বিল্ডার্স। প্রকল্পের ১৭ ভাগের মধ্যে আট ভাগ কাজ পায় মেসার্স বিশ্বাস বিল্ডার্স।

একইভাবে এমএম বিল্ডার্সের সঙ্গে যৌথভাবে দুই প্যাকেজের কাজ পায় রয়েল এসোসিয়েট। প্রায় ৫৬ কোটি টাকার কাজ পায় এই দুই প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির মালিক পটিয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) যুবলীগ নেতা দিদারুল আলম।

রয়েল এসোসিয়েটের মোহাম্মদ এমরান বলেন, ‘চর জেগে খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় নির্মাণসামগ্রী পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পাথর সংকট সৃষ্টি হয়। এসব কারণে কাজের প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়। এখন প্রকল্প এলাকায় পাথর ও নির্মাণসামগ্রী আনা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু করা হবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর-২ বিভাগ) ড. তানজির সাইফ আহমেদ পূর্বকোণকে বলেন, ‘ব্লকের সাইজ আগের চেয়ে ছোট হওয়ায় প্রকল্পে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। এসব টাকায় বেড়িবাঁধের কাজ বাড়ানো হবে।’ তিনি বলেন, ‘যেকোনোভাবে আমরা প্রকল্পের কাজ শেষ করতে চাই। অন্য ঠিকাদাররা দ্রুত কাজ শুরু না করলে প্রয়োজনে আরও কাজ বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে।’

২০২৩ সালের ১৮ জুলাই স›দ্বীপে ভাঙন প্রতিরোধে ৫৬২ কোটি ২১ লাখ টাকার প্রকল্প নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০২৪ সালের ১৭ ভাগে ভাগ করে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। কিন্তু কাজ পাওয়া বেশির ভাগ ঠিকাদারই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা। ক্ষমতার পালা বদলের পর ঠিকাদারদের কেউ হন গ্রেপ্তার, কেউ চলে যান আত্মগোপনে। বড় ঠিকাদাররা উধাও হয়ে যাওয়ায় কাজের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। ঠিকাদারের গাফিলতিতে প্রকল্পটি নিয়ে পৌনে ৩ বছর ধরে হাবুডুবু খাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বার বার তাগাদা, কার্যাদেশ বাতিল ও কালো তালিকাভুক্তির ভয় দেখিয়েও ঠিকাদারদের কাজে ফেরানো যায়নি। এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে মাত্র ৮-৯ শতাংশ। অথচ প্রকল্পটি আগামী বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

পাউবো সূত্র জানায়, ৫৬২ কোটি টাকার প্রকল্প কাটছাঁট হওয়ায় ব্যয় কমিয়ে ৪০০ কোটির মধ্যে আনা হবে। প্রায় ১৫০ কোটি টাকার মতো সাশ্রয় হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (সন্দ্বীপ পওর শাখা) উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পুর) মো. আরিফুর রহমান পূর্বকোণকে বলেন, ‘সাশ্রয় হওয়া টাকা দিয়ে রহমতপুর থেকে মুছাপুর পর্যন্ত নতুন করে বাঁধ নির্মাণ ও ব্লক বসানো হবে। ৮ দশমিক ১৪ কিলোমিটার থেকে বেড়ে বেড়িবাঁধের আকার দাঁড়াবে ১২ দশমিক ৫০ কিলোমিটার।’

খুলনা শিপইয়ার্ড তিনটি প্যাকেজে ৮৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকার কাজ পায়। প্রতিষ্ঠানটির দুই প্যাকেজের কাজ অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলের চিন্তাভাবনা করছে পাউবো। এছাড়া মাটি ভরাটের কাজ পায় মেসার্স হাসান এন্ড ব্রাদার্স এবং জামান ব্রাদার্স নামে দুটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এই দুই প্রতিষ্ঠান মাটির বাঁধ নির্মাণের কাজ করেছে বলে জানায় পাউবো।

প্রকল্পে ২১ লাখ ব্লক বসানোর কথা রয়েছে। এছাড়া সাগর তীর ভাঙনরোধে ১২ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার টেকসই বাঁধ নির্মাণ, ২টি নতুন স্লুইট গেট নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ৭টি পুরনো স্লুইস গেট মেরামতে ৫৬২ কোটি টাকার প্রকল্প নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

 

পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট