চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬

কালুরঘাটে রেলভূমিতে ‘বালুখেকোদের’ রাজত্ব

কালুরঘাটে রেলভূমিতে ‘বালুখেকোদের’ রাজত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক

৬ নভেম্বর, ২০২৬ | ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ

কর্ণফুলী নদীর ওপর শতবর্ষী কালুরঘাট সেতুর দুই পাড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে অবৈধ বালুর কারবার। রেলের জায়গা দখল করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এই বালু বাণিজ্য। সেতুর পশ্চিম পাড়ে নগরীর অংশে সড়ক পর্যন্ত দখল করে বালু রাখা হয়েছে। চার লেন সড়কের অর্ধেক অংশজুড়ে বালু বহনকারী ডাম্পার ও ট্রাক স্ট্যান্ডে পরিণত করেছে। এতে প্রতিনিয়ত যানজট লেগে থাকে কালুরঘাটে। 
 
এদিকে, অবৈধ বালু-বাণিজ্য ও ‘বালুখেকোদের’দৌরাত্ম্য নিয়ে টেনশনে রয়েছে উপজেলা প্রশাসন। অবৈধ বালু উত্তোলন ও বালু পরিবহনের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান পরিচালনার পরও লাগাম টেনে ধরতে পারছে না প্রশাসন। ২৫-৩০ টন ওজনের বালুবাহী ট্রাক চলাচল প্রতিরোধে সড়ক হাইড ব্যারিয়ার (প্রতিবন্ধকতা) স্থাপন করা হয়। কিন্তু ৩১ অক্টোবর সেই প্রতিবন্ধকতা গুঁড়িয়ে দেয় বালুখেকোরা। তবে পরের দিন ওই প্রতিবন্ধকতা পুনঃস্থাপন করা হয়।
 
ইউএনও মেহেদী হাসান ফারুক বলেন, ‘বোয়ালখালীতে বৈধ কোনো বালুমহাল নেই। অবৈধ বালু উত্তোলন ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
 
চলতি বছরের ৫ আগস্ট নগরীর কালুরঘাট থেকে সিএন্ডবি পর্যন্ত এলাকার নৈরাজ্য নিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দৈনিক পূর্বকোণ। ‘অভিভাবকহীন আড়াই কিলোমিটারে নরক যন্ত্রণা’ শিরোনামে ওই প্রতিবেদন ছয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। গুচ্ছ-প্রতিবেদনে ‘রেলের জায়গা দখল করে বালু-বাণিজ্য, জেগে ঘুমাচ্ছে রেল’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়।
 
ওই সময়ে পূর্বাঞ্চলীয় রেলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেছিলেন, ‘কানুনগো পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও ঘুম থেকে জেগে ওঠেনি রেল। 
 
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, কালুরঘাট খেজুরতল, ফেরিঘাট ও খালের তীর ঘেঁষে রয়েছে অর্ধ শতাধিক বালু-বিক্রয় কেন্দ্র। এসব জায়গায় রেলের বিট দিয়ে ঘেরা রয়েছে। তবে প্রবেশমুখে রেলের বিট কেটে বালুবাহী ট্রাক চলাচল করছে। অবৈধ দখলদার মুক্ত করার সুরক্ষা বিট কেটে পুরোদমে বালু-বাণিজ্য চলে আসলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি রেল। 
 
দেখা যায়, কালুরঘাট ও খেজুরতলা এলাকায় আরাকান সড়ক দখল করে পার্কিং করেছে অন্তত শতাধিক মিনি ট্রাক। এসব ট্রাকে করে বালু পরিবহন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানান, রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা রেলের শত শত একর জায়গা দখল করে লুটেপুটে খাচ্ছে। রেলের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এই দখলদারত্ব চলে আসছে। সরকার যায়, সরকার আসে রেলের জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত হয় না। বালুবাহী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা ও যানজট নিত্যনৈমিত্তিক কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
 
অপর দিকে, কালুরঘাট সেতুর পূর্ব পাড়ে বোয়ালখালী অংশে নদীর তীর দখল করে বালুর হাট গড়ে তোলা হয়েছে। বলগেট ও মেশিন দিয়ে সরাসরি এসব হাটে বালু তোলা হচ্ছে। ওই পাড়েও রেল ও সরকারি খাস জমি দখল করে বালুমহাল বানানো হয়েছে। 
 
জেলা প্রশাসনের বালুমহাল সংক্রান্ত নথি ঘেঁটে দেখা যায়, কর্ণফুলী নদীর বোয়ালখালীতে বৈধ কোনো বালুমহাল নেই। কিন্তু বোয়ালখালীর কধুরখীল, চরণদ্বীপ ও শ্রীপুর-খরণদ্বীপ এলাকা থেকে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলে আসছে।
 
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা অন্তত ৩০ বছর ধরে বোয়ালখালীর বিভিন্ন অংশ থেকে বালু উত্তোলন করে আসছেন। রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার আমলে দলটির শীর্ষ নেতারা অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িত ছিল। 
 
একইভাবে সরকার পতনের পর বিএনপির শীর্ষ নেতারা অবৈধ বালু উত্তোলন-ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। যেততেনভাবে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে কর্ণফুলীর ভাঙনও তীব্র রূপ নিয়েছে। স্থানীয়রা প্রতিবাদ ও মানববন্ধন করেও কোনো প্রতিকার পাননি।
 
গত ১৮ অক্টোবর স্থানীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর নির্দেশনায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুটি সড়কে হাইড ব্যারিয়ার (উচ্চতা প্রতিবন্ধকতা) স্থাপন করা হয়। 
 
স্থানীয়রা জানান, সড়কে উচ্চতা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির পর এখন কালুরঘাট এলাকা থেকেই ২৫-৩০ টন ভারী ওজনের ট্রাকে বালুভর্তি করা হয়। এসব বালুর চট্টগ্রামের বাইরে অন্য জেলা সরবরাহ করা হয়। 
 
পূর্বকোণ/এমএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট