দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সবজি ভাণ্ডার নামে ক্ষেত শঙ্খ নদীর চরের বুকজুড়ে এখন শুধুই হাহাকার। এবারের আকস্মিক বন্যায় এ অঞ্চলের হাজারো সবজি চাষির সোনালী স্বপ্নে নির্মম কুঠারাঘাত করেছে বন্যার পানি। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৮০ কোটি টাকার অধিক।
গত ৫ জুলাই থেকে ৮ দিনব্যাপী লাগাতার বিরামহীন বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে শঙ্খ নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ সবজি চাষের জমি। বন্যার পানি নেমে গেলেও রেখে গেছে ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষতচিহ্ন। নদীর প্রবল স্রোতের সাথে আসা বালুর মোটা আস্তরণে ঢাকা পড়েছে শঙ্খ চরের এক সময়ের উর্বর পলিমাটি। ফলে পানি নেমে যাওয়ার পরেও নতুন করে চাষাবাদ শুরু করা এখন চাষিদের জন্য অত্যন্ত দুরুহ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সবজির চাহিদার একটি বড় অংশ জোগান দেন এই শঙ্খ চরের চাষিরা। সারা বছরই এখানে বিপুল পরিমাণ শাকসবজি উৎপাদিত হয়। কিন্তু এবারের বন্যায় সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সবজি সংকটে পরবে পুরো চট্টগ্রাম। শঙ্খ চরের অধিকাংশ সবজি চাষিরা স্থানীয় এনজিও অথবা ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সবজি চাষাবাদ করেছিলেন। আশা ছিল বাম্পার ফলনে ঋণের টাকা শোধ করে লাভবান পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। ফসল হারিয়ে এখন তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। একদিকে ঋণের টাকা পরিশোধের তাগাদা, অন্যদিকে পরিবারের দৈনিক ভরণপোষণ—সব মিলিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন দিশেহারা কৃষকেরা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই মুহূর্তে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত দ্রুত পুনর্বাসন সহায়তা না পেলে শঙ্খ চরের সবজি চাষিরা আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন না। আর এর একটি দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো দেশের সবজি বাজারে। যার ফলে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে নিত্যদিনের সবজির দাম।
এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনরায় কৃষিকাজে ফিরিয়ে আনতে এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবজি ভাণ্ডারকে সচল করতে জরুরি ভিত্তিতে কি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন কৃষি বিভাগের একটি উচ্চ পর্যায়ের দল। গত বুধবার শঙ্খ চরের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পরিদর্শনকালে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাথে সরাসরি কথা বলেন এবং তাদের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ শোনেন। এসময় তার সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা, অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) রঘুনাথ নাহা, উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. আজাদ হোসেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রূপায়ন চৌধুরী, উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ আরিফ এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সৈকত বড়ুয়া, রিপন দাশসহ স্থানীয় কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ।
পরিদর্শন শেষে কর্মকর্তারা জানান, বালুর আস্তরণ পড়ে নষ্ট হওয়া জমিগুলোকে কিভাবে পুনরায় চাষ উপযোগী করা যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় এনে বীজ, সার ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। শঙ্খ চরের কৃষকদের এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সরকার আন্তরিকভাবে পাশে থাকবে বলে আশ্বস্ত করেন তারা। চন্দনাইশে বন্যায় আউস ধানক্ষেত, আমনের বীজতলা, ৯১০ হেক্টর সবজিক্ষেত বন্যার পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া বন্যার পানিতে ধোপাছড়ি, কাঞ্চননগর, ছৈয়দাবাদ পাহাড়ি এলাকা, বরমা, বৈলতলী এলাকার সবজিক্ষেত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ৮০ কোটি টাকার ক্ষতিসাধন হয় জানা যায়। এই ক্ষতি পুশিয়ে উঠতে কৃষদের হিমশিম খেতে হবে।
পূর্বকোণ/পিআর















