স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি গুছিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এরই অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদের ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক দলগুলো গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু করেছিল। কয়েকটি দল সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তবে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রাম সফরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি ও দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। এরপর নির্বাচন নিয়ে তোড়জোড় বেড়েছে বিএনপিতে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, চট্টগ্রামের ১৫টি পৌরসভার মধ্যে ১৪টি নির্বাচনের উপযোগী রয়েছে। সীমানা জটিলতার কারণে একটিতে নির্বাচনের উপযোগী নেই বলে মতামত দিয়েছে। ১৬ উপজেলার মধ্যে সবকটি নির্বাচনের উপযোগী রয়েছে। ১৯১টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ১৮৯টি নির্বাচন করা যাবে।
নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ১০ আগস্ট ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের তালিকা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ৬৭ লাখ ২৬ হাজার ৬৯৬ জন। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের ভোটার সংখ্যা ১৯ লাখ ৫৮ হাজার ৯০৫ জন। সিটি করপোরেশনের ৪১ ওয়ার্ডে ৭২৫টি ভোটকেন্দ্রের বিপরীতে ৩ হাজার ৯৫৭টি কক্ষ রয়েছে। নবগঠিত ফটিকছড়ি উত্তরসহ ১৬টি উপজেলা পরিষদের মোট ভোটার ৪৭ লাখ ৬৭ হাজার ৭৯১ জন। ১ হাজার ৪৭৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ৯ হাজার ১১২টি কক্ষ রয়েছে।
১৬ উপজেলায় ১৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদে মোট ভোটার রয়েছে ৪২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৬৯ জন। তালিকায় ১ হাজার ৭৮১টি ভোটকেন্দ্র ও ৮ হাজার ১৫৩টি ভোটকক্ষ রয়েছে। ১৪ পৌরসভায় মোট ভোটার রয়েছে ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৫৮৭ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ২১৯টি। ভোটকক্ষ ১ হাজার ৯৫টি।
গ্রাম-গঞ্জে তোড়জোড় :
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে জেলার গ্রাম-গঞ্জে সরব হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বিএনপিদলীয় প্রার্থীরা মাঠে-ঘাটে জোরালো প্রচার শুরু করেছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে শুরু করে সামাজিক অনুষ্ঠানে ঘন ঘন যোগদান করে নিজেদের প্রার্থিতার কথা জানান দিচ্ছেন। ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে দোয়া নিচ্ছেন।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গ্রামাঞ্চলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। জনসমাগম এলাকায় সাঁটানো হয়েছে পোস্টার-ব্যানার ও বিলবোর্ড। সম্ভাব্য প্রার্থী ছাড়াও পছন্দনীয় নেতা-প্রার্থীর পক্ষে পোস্টার-ব্যানার সাঁটিয়েছে কর্মী-সমর্থকেরা। প্রচারে আরও এক ধাপ এগিয়ে চলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
চলতি মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ইঙ্গিত দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে হালনাগাদ ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে ইসি।
চট্টগ্রাম জেলা সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বশির আহমেদ পূর্বকোণকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির লক্ষ্য নিয়ে ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। আমাদের প্রস্তুতি গুছিয়ে রাখছি। নির্বাচন কমিশন থেকে যখনই যেই নির্দেশনা আসবে, সেই নির্দেশনা মতে কাজ করবো আমরা।’
বিএনপিতে একক প্রার্থীর নির্দেশনা :
গত ৯ আগস্ট চট্টগ্রাম সফর করে গেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নগরীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে চট্টগ্রামের তিন সাংগঠনিক ইউনিট (চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা) নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি ও নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন।
স্থানীয়ভাবে সমঝোতার মাধ্যমে দলের একক প্রার্থী করানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘দলে একাধিক প্রার্থী থাকতেই পারে। এক্ষেত্রে কাউকে নির্বাচন করার সুযোগ, আর কাউকে দলের পদ-পদবি পাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। নির্মোহভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দলীয় প্রার্থী বিজয়ী হতে হবে।’
উত্তর জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত ও তৃণমূলের কমিটির কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণের কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা তৃণমূল নেতাকর্মীদের।
উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ফটিকছড়ি আসনের সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর এ বিষয়ে পূর্বকোণকে বলেন, ‘শিগগির উত্তর জেলা বিএনপি ও তৃণমূলের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।’ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এলাকায় প্রার্থীদের ভিত্তি, জনপ্রিয়তা, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও প্রার্থীর চরিত্রসহ নানা বিষয়ে জরিপ করা হচ্ছে। একাধিক জরিপের ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাই করা হবে।’
দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি থাকলেও তৃণমূলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। জেলার সবকটি উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তৃণমূল ও দলের শীর্ষ নেতারা।
এ বিষয়ে দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া পূর্বকোণকে বলেন, ‘দক্ষিণ জেলার তৃণমূল কমিটি নেই। বড় দল হিসেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু কমিটি না থাকলে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এজন্য নির্বাচনের আগে তৃণমূল কমিটি গঠন করতে হবে।’
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সরকার পতনের পর এমপি-মন্ত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরাও আত্মগোপনে চলে যান। সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিল অন্তবর্তীকালীন সরকার। দুই বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার কার্যক্রম চলছে টানাটানি করে। এসব কারণে নাগরিক সেবা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।
পূর্বকোণ/ইবনুর
















