বাঁশখালী কাথরিয়া ইউনিয়নে আশেক। শখ নয়, জীবিকার তাগিদে করেন মুরগির খামার। ভালই কাটছিল জীবন-জীবিকা। কিন্তু বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে তার খামার। মারা যায় এক হাজার মুরগি। কয়েক দিন আগে লাখপতি ছিলেন আশেক। তিনি এখন নিঃস্ব।
শুধু আশেক নন, বাঁশখালীতে হাজার হাজার আশেকের স্বপ্ন ভেসে গেছে বানের পানিতে। বাঁশখালীর মতো সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলা বন্যায় ডুবে গেছে। জেলা প্রশাসনের হিসাবে ৮০-৯০ শতাংশ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। পানিতে ভেসে গেছে খামারিদের পুকুর-দিঘির মাছ ও গবাদি পশু। বড় ক্ষতি হয়েছে কৃষি খাতেও। রোপা আউশ ও আমনের বীজতলা এখনো পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে।
সরকারের প্রাথমিক হিসাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের ক্ষয়-ক্ষতি ধরা হয়েছে প্রায় ১৩৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এরমধ্যে মৎস্য বিভাগের ক্ষতি ১০৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকা। প্রাণিসম্পদের ক্ষতি ২৮ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের ডা. আসিফুল হক জানান, পশ্চিম বাঁশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নে বন্যার অবস্থা খুবই ভয়াবহ। মাটির ঘরবাড়িগুলো দেবে গেছে। বহু ঘরবাড়ি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। মানুষের পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। খামারের মুরগি মারা গেছে। হাজার হাজার মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। গত দুইদিন (শুক্র-শনিবার) বৃষ্টি কিছুটা কমলেও বন্যার পানি এখনো কমেনি। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালীতে এখনো কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী। খাদ্য ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘সাতকানিয়ার ৯০ ভাগ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত। প্রায় চার লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দী। এছাড়াও বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’
ভেসে গেছে ১০৯ কোটি টাকার মাছ: মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে ১০৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকা। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, ‘বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। পানি নামার পর চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হবে।’
জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, ১২ হাজার ২৫১টি পুকুর-দিঘি ও ৩২০টি মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। মৎস্য বিভাগের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালীতে। এক হাজার ৮৮০টি পুকুর ও ৩১০টি ঘের তলিয়ে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫১ কোটি ৬৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এছাড়াও সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারায় উপজেলা ক্ষতি বেশি হয়েছে।
মারা গেছে সাড়ে ৮৮ হাজার গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি: জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর জানান, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। ৩১টি গরু, ৮৭টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া ও ৮৭,৩৯৫টি মুরগি এবং এক হাজার হাঁস মারা গেছে।
প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাত ছাড়াও কৃষি বিভাগের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক তথ্য মতে, ৯০৪৩ দশমিক ৫ হেক্টর জমির আউশ ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। আমনের বীজতলা ডুবেছে ১৮১২ দশমিক ১৬ জমিতে। আর গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষতি হয়েছে ২৫৯৪ দশমিক ১৭ হেক্টর জমির।
পূর্বকোণ/নুসরাত
















