চট্টগ্রাম শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

বন্যায় বিপর্যস্ত সাড়ে ৭ লাখ মানুষ

চট্টগ্রামে বন্যায় বিপর্যস্ত সাড়ে ৭ লাখ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ জুলাই, ২০২৬ | ১২:৩৬ অপরাহ্ণ

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের বন্যায় বিপর্যস্ত দক্ষিণ চট্টগ্রাম। জেলার বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি হিসাব মতে, এই তিন উপজেলার ৮০-৯০ শতাংশ এলাকা তলিয়ে গেছে। এছাড়াও চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও বোয়ালখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ছাড়াও উত্তর চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলায় বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইভাবে নগরীর বিভিন্ন স্থানে এখনো মানুষ পানিবন্দী রয়েছে।

 

গতকাল শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে সভা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনলাইনে সভার বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা পূর্বকোণকে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বন্যার চিত্র তুলে ধরেছি। তাঁকে বলেছি, চট্টগ্রাম বড় এলাকা। লোকজন বেশি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেশি হয়েছে। সরকারি ত্রাণ সহায়তা বাড়ানোর আবেদন করেছি। চট্টগ্রামের জন্য সরকারি সহায়তা বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।’ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

গত কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। জেলার কয়েকটি উপজেলায় ভয়াবহ রূপ নেয়। মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। গতকাল শুক্রবার বৃষ্টি কিছুটা কমলেও বন্যার পানি এখনো কমেনি। বিশেষ করে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালীর পরিস্থিতি বেশি সংকটাপন্ন।

জনজীবন ছাড়াও গবাদি পশু ও কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য মতে, মৎস্য বিভাগের ক্ষতি ধরা হয়েছে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। আর প্রাণিসম্পদ বিভাগের ক্ষতি ধরা হয়েছে ২৭ কোটি ১৮ লাখ টাকার।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা গতকাল শুক্রবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স সভায় তুলে ধরা হয়েছে।’ জেলা প্রশাসন জানায়, এখন পর্যন্ত বন্যায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ১০ জন। এর মধ্যে শুক্রবার বাঁশখালীতে বানের পানিতে ভেসে গেছে দুই শিশু। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক এবং সাতকানিয়া-বান্দরবান সড়কে পানি ওঠে। কক্সবাজার সড়কে যান চলাচল করলেও বান্দরবানের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। রেল লাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল চলাচলও বন্ধ রয়েছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা গতকাল শুক্রবার সাতকানিয়ার বিভিন্ন দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় উপজেলা পরিষদ চত্বরে তিনি বলেছেন, পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার অনেকাংশ পানির নিচে রয়েছে। বিশেষ করে সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়নের মধ্যে সব কয়টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিসি জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘সাতকানিয়ার ৯০ ভাগ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত। প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দী। এছাড়াও বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখনো মানুষ পানিবন্দী আছেন।’

জেলা প্রশাসন গত বৃহস্পতিবার জানায়, চট্টগ্রামে সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। সরকার বন্যার সার্বিক বিষয়ে অবগত রয়েছে। সরকার চট্টগ্রামের জন্য ৫৫০ টন চাল ও ৫৫ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা বরাদ্দ দিয়েছে। দুর্গত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় থেকে ৭০০ টন চাল ও ৬০ লাখ টাকার বরাদ্দ পেয়েছেন বলে জানান ডিসি জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
দক্ষিণ চট্টগ্রাম ছাড়াও উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার মানুষও বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। তিন-চার দিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় মানুষ পানিবন্দী রয়েছে।

সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়ার অনেক এলাকায় এখনো লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন বড় ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন লোকজন। তাদের মধ্যে শুকনো খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও খাবার পানি বিতরণ করা হয়েছে। তবে পানির কারণে সব জায়গায় খাবার ও ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সাতকানিয়া সদরের আবদুল বাসেত ও তাদের পরিবার তিন দিন ধরে পানিবন্দী ছিলেন। আজ থেকে পানি কিছুটা নামতে শুরু করেছে। তারা এবং আশপাশের বিভিন্ন পরিবার এতদিন খাবার কষ্টে দিনাতিপাত করেছেন। তিনি বলেন, পাশের স্কুলে গিয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু নারী ও শিশুরা আশ্রয়কেন্দ্রে বেশি কষ্টে ছিল। খাবার ঠিকমতো দেওয়া হয়নি। তিন দিন পর আজ পানি নেমে যাওয়ায় ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন তারা।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর জানিয়েছেন, ‘প্রাথমিক হিসাবে এ পর্যন্ত প্রায় ২৭ কোটি ১৮ লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ২৩টি গরু, ৮৪টি ছাগল ও ৪৩ হাজার মুরগী মারা গেছে।’

তবে মৎস্য বিভাগের ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম। ৯৯৩৩টি পুকুর-দিঘি ও ৩২০টি ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ পুরোটায় ডুবে গেছে। আনোয়ারা, পটিয়া, হাটহাজারী উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতির চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হবে।

প্রাণিসম্পদ, মৎস্য বিভাগ ছাড়াও কৃষি বিভাগের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক তথ্য মতে, প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমির আউশ ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। আমনের বীজতলার ক্ষতি হয়েছে ৬৫২ দশমিক ৬৬ হেক্টর জমিতে। আর গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষতি হয়েছে ৪৯০৭ হেক্টর জমির।

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট