আনোয়ারায় দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ ঘিরে চট্টগ্রামে বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির স্বপ্ন ডানা মেলছে। চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি এই অঞ্চল গড়ে উঠলে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পরিণত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন- বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা নিয়েও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল পরিচালনার মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণ করে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করছে। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ এখন এই পথে হাঁটছে। কারণ মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল শুধুমাত্র বিনিয়োগ বৃদ্ধি নয়, একসাথে অনেকগুলো খাতের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
আনোয়ারায় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে বিদেশিদের পাশাপাশি দেশি উদ্যোক্তাদেরও বিনিয়োগের সুযোগ দিতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার দাবি ব্যবসায়ী নেতাদের। এটি করা গেলে দেশে শিল্পায়ন যেমন টেকসই হবে তেমনি তা দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক ও অধিক কর্মসংস্থানের উৎস হয়ে উঠতে পারবে বলেও মনে করছেন তারা। তবে এ জন্য বেশকিছু চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দিলেন এই খাতের বিশেষজ্ঞরা| তারা জানান- সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- সঠিক সময়ে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল বাস্তবায়ন করা। এছাড়া কর্ণফুলীর ওই পাড়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ অন্যান্য ইউটিলিটি সংযোগের ব্যবস্থা করা, বড় বড় সড়ক ও অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং উপকূলীয় এলাকা হওয়ায়-প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতের চ্যালেঞ্জের কথা মাথায় রেখেই এগোতে হবে।
সঠিক সময়ে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
প্রফেসর ড. শাহাদাত হোছাইন
অধ্যাপক, ফাইন্যান্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্বের অনেক দেশে জনপ্রিয় হলেও সম্প্রতি বাংলাদেশের আনোয়ারায় প্রস্তাবিত ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ বা ‘ফ্রি ট্রেড জোন’ এখনও ধারণাগত পর্যায়ে রয়েছে| যখন এটি কার্যকর হবে, তখন এর টেকনিক্যাল বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা আস্তে আস্তে জানতে পারবো। এর সম্ভাব্য সুবিধা কি কি হতে পারে-সে সম্পর্কে অবগত হতে পারবো। সাধারণত মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল হচ্ছে-যেখানে একটি দেশের কর কাঠামো বা শুল্ক কাঠামোর বাইরে গিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অনেকটা ‘অফশোর আইডিয়ার’ মতো। এই ধরনের অঞ্চলে বিনিয়োগকারীরা অত্যন্ত কম বিধিনিষেধে পণ্য রাখা, প্রক্রিয়াজাত করা এবং পুনঃরপ্তানি করার সুযোগ লাভ করেন।
চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, শাহ আমানত বিমানবন্দর ও বিদ্যমান ইপিজেডগুলোর ˆনকট্য আনোয়ারাকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি স্বাভাবিক লজিস্টিক হাবে পরিণত করতে পারে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, রপ্তানি পণ্যের লিড-টাইম কমবে এবং তৈরি পোশাকের বাইরে ইলেকট্রনিকস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, প্যাকেজিং ও আঞ্চলিক বিতরণের মতো নতুন খাত যুক্ত হয়ে রপ্তানি বহুমুখী হবে।
ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর এবং বন্দর-ব্যবহার বাড়বে-সব মিলিয়ে জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে| দুবাইয়ের জেবেল আলী এমন একটি উদাহরণ, যেখানে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মুক্ত অঞ্চল ও বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে বিপুল বিনিয়োগ এসেছে।
তবে এই ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে-সঠিক সময়ে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল বাস্তবায়ন করা| কারণ ২০১৫ সালে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত খুব সামান্যই এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল করার ক্ষেত্রেও যদি এই ধরনের ধীরগতি দেখা যায়-তাহলে পুরোপুরি সুফল পাওয়া কঠিন।
এর বাইরে কর্ণফুলীর ওই পাড়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ অন্যান্য ইউটিলিটি সংযোগের ব্যবস্থা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ| মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের জন্য বড় বড় সড়ক ও অবকাঠামোর প্রয়োজন হবে। যেগুলো আনোয়ারায় গড়ে উঠেনি। আবার উপকূলীয় এলাকা হওয়ায়- প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এসব চ্যালেঞ্জের কথা মাথায় রেখেই এগোতে হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে-চ্যালেঞ্জগুলো আমরা কীভাবে মোকাবিলা করবো| প্রথমেই আমাদের মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ার উপযোগী করে অবকাঠামো ˆতরি করতে হবে। এরপরই প্লট বরাদ্দের কাজ শুরু করা যেতে পারে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সবকিছু একসঙ্গে না করে পর্যায়ক্রমে ও পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়নটা গুরুত্বপূর্ণ। ইউটিলিটির বিষয়টা এখানে খুব সেনসিটিভ।
মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের জন্য ডেডিকেটেড ইউটিলিটি সার্ভিস ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে| প্রয়োজনে ওয়ানস্টপ সার্ভিসের ব্যবস্থা করতে হবে| তবে এটাও মনে রাখতে হবে-এসব উদ্যোগের কারণে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল যেন বিচ্ছিন্ন কোন এলাকা হয়ে না যায়। বিদেশি বিনিয়োগের প্রযুক্তি স্থানীয়ভাবে স্থানান্তর হওয়াও জরুরি।
শিল্পে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বৃদ্ধিতে অনন্য মাত্রা যুক্ত করবে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল
মোহাম্মদ আমিরুল হক
সভাপতি, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি
বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে অর্থাৎ চট্টগ্রাম বন্দর এবং মাতারবাড়ী সমুদ্র বন্দরের নিকটবর্তী এলাকায় দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকারের অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। চট্টগ্রাম তথা দেশের সর্বস্তরের ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই।
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বেসরকারি খাতের উন্নয়নকে সর্বদা অগ্রাধিকারে রাখা জরুরি এবং এজন্য শিল্পায়নের কোন বিকল্প নেই। মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের যে কনসেপ্ট তা যে কোন দেশের শিল্পে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বৃদ্ধিতে অনন্য মাত্রা যুক্ত করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা নিয়েও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল পরিচালনার মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণ করে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করছে।
তবে প্রাকৃতিক সম্পদ বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটা সুবিধাজনক। ভৌগলিকভাবে বিশেষ করে প্রাকৃতিক বন্দর এবং পাহাড়, নদী ও সমতল এই চারের সমন্বয়ে চট্টগ্রাম সর্বদা শিল্পায়ন তথা বিনিয়োগের উপযুক্ত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে, তাহলে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল কেন নয়?
চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক নগরী বলে আখ্যায়িত করা হলেও তা প্রকৃতরূপে বাস্তবায়নের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন জরুরি| আমি মনে করি, এই অঞ্চলে দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল স্থাপন সরকারের সেই পরিকল্পনা এবং একইসাথে নতুন শিল্পাঞ্চল স্থাপনের মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগের অংশ।
মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের অতি দ্রুত জায়গা নির্ধারণের পাশাপাশি ফিজিবিলিটি স্টাডি ও অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়া আনোয়ারাতে যে সিইআইজেড প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে সেটি মাথায় রেখে কাছাকাছি আরেকটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের জন্য যথাযথ যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের মত প্রয়োজনীয় ইউটিলিটিজের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাস্তবমুখী টেকসই পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল শুধুমাত্র বিনিয়োগ বৃদ্ধি নয়, একসাথে অনেকগুলো খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীর যাতায়াত বৃদ্ধির ফলে পর্যটনের বিকাশ ঘটে| তাই পর্যটন শিল্পের জন্যেও আধুনিক উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া প্রয়োজন।
যেহেতু, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে বিদেশিদের পাশাপাশি দেশি উদ্যোক্তাদেরও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, তাই দেশি বিনিয়োগকারীদের মূলধন যোগানের বিষয়টি মাথায় রেখে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনাসহ ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে শিল্পায়ন যেমন টেকসই হবে তেমনি তা দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক ও অধিক কর্মসংস্থানের উৎস হয়ে উঠতে পারবে।
বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল
খলিলুর রহমান
সভাপতি, চিটাগং মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি
অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং কক্সবাজারে দেশের প্রথমবারের মতো মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন) প্রতিষ্ঠার যে অনুমোদন দিয়েছে, সেটিকে চিটাগং মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানায়। এই উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ।
আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলটি অনেকটা ইপিজেডের আদলেই পরিচালিত হবে। এখানে ব্যবসায়ীরা শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করতে পারবেন এবং সেই কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করবেন। তবে এই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের পণ্য স্থানীয় বাজারে বা দেশের অন্য কোনো মার্কেটে বিক্রি করার কোনো সুযোগ থাকবে না। অর্থাৎ, এটি হবে সম্পূর্ণ রপ্তানিমুখী একটি এলাকা, যেখানে কনটেইনার খোলা, পণ্য প্রস্তুত করা এবং পুনরায় কনটেইনার ভর্তি করে বিদেশে পাঠানোর যাবতীয় কাজ জোনের ভেতরেই সম্পন্ন হবে।
এই মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ফলে আমাদের অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক দিক ফুটে উঠবে। যেমন কর্মসংস্থান এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সুফল হবে ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। ইপিজেডের মতো এখানেও বিপুল সংখ্যক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে, যা বেকারত্ব হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখবে| এছাড়া সরকারি আয় বাড়বে। এই জোন থেকে সরকার বড় অংকের বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল তথা ইউটিলিটি চার্জ বাবদ আয় করতে পারবে। এছাড়া শিল্প কারখানার জন্য নির্ধারিত স্পেস বা জায়গার ভাড়ার মাধ্যমেও সরকারের স্থায়ী আয়ের উৎস ˆতরি হবে। পাশপাশি বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি হবে| মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলের কার্যক্রম শুরু হলে লজিস্টিক সাপোর্ট হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবহার বাড়বে, যার ফলে বন্দরের আয় ও কর্মতৎপরতা দুই-ই বৃদ্ধি পাবে।
পরিশেষে, আমরা মনে করি এই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল দেশের অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে| সঠিক তদারকি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। সরকারের এই সাহসী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ সফল করতে চিটাগং মেট্রোপলিটন চেম্বার সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানে প্রস্তুত।
পূর্বকোণ/রাকিব















