রবীন্দ্রনাথের শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্যের বৈচিত্রময় প্রতিভার একটি উজ্জ্বল দিক হচ্ছে নাটক। বিভিন্ন ধরনের নাটক তিনি লিখেছেন। নাটক, কাব্যনাটক, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, সাংকেতিক নাটক, ঋতু নাটক, প্রহসন প্রভৃতি নাটক সৃষ্টিতে তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। অনেক নাট্য-ব্যক্তিত্ব তাঁদের আলোচনা সমালোচনায় রবীন্দ্রনাথের নাট্য- প্রতিভাকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। রবীন্দ্রনাথকৃত সকল নাটক শিল্পের মান বিচারে উৎকর্ষের চরম সীমানায় উপনীত হয়েছে। এই সত্য নাট্যবোদ্ধাদের জন্য একটি অপার বিস্ময়। নাটক রচনা ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ নাটকের অভিনয়, পরিচালনা, মঞ্চসজ্জা, সঙ্গীত পরিচালনা ইত্যাদি নাট্য-সম্পৃক্ত ক্রিয়াকর্মে অসামান্য নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন।
১৯৮১ সালে নিজের লেখা গীতিনাট্য বাল্মিকী প্রতিভার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ প্রথমবারের মতো মঞ্চে নিজেকে উপস্থাপিত করেন। নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকনন্দিত হয়েছিলো। এই নাটকের সফল মঞ্চায়নে তিনি অসাধারণ মেধা ও শ্রম ব্যয় করেছিলেন। নাটকটির প্রযোজনা ও সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বও নিয়েছিলেন তিনি।
নাট্যদৃশ্যের সাথে সংগতি রেখে মঞ্চের সজ্জায় রবীন্দ্রনাথ বিশ^াসী ছিলেন না। তিনি এই ধরনের মঞ্চ-সজ্জা পছন্দও করতেন না। নাটকের অভিনয়ের সময় বোদ্ধা দর্শকদের অন্তরে যে একটি কাল্পনিক দৃশ্যপটের সৃষ্টি হয় রবীন্দ্রনাথ একেই গুরুত্ব দান করতেন বেশী। রবীন্দ্রনাথ এই ব্যাপারে তাঁর রঙ্গমঞ্চ প্রকল্পে লিখেন। ভাবুকের চিত্তের মধ্যে রঙ্গমঞ্চ আছে, সেই রঙ্গমঞ্চে স্থনাভাব নাই। সেখানে যাদুকরের হাতে দৃশ্যপট আপনিই রচিত হতে থাকে। সেই মঞ্চে সেই পটই নাট্যকারের লক্ষ্যস্থল। তিনি আরও বলেন, ‘চিত্রপটের প্রয়োজন নেই, আমার দরকার চিত্তপটের।’
রবীন্দ্রনাথের অভিনয় শৈলী ছিলো চমৎকার। নিজের রচিত অনেক নাটকে তিনি অভিনয় করে নিজেকে একজন নিপুণ অভিনেতা হিসেবে প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রের সাথে অভিনয়ের সামঞ্জস্য ছিলো অনবদ্য। তাঁর অভিনয় ছিলো নেচারেল। অভিনয়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বাহুল্যকে তিনি প্রশ্রয় দিতেন না। তাঁর অভিনীত প্রতিটি নাটক এবং মঞ্চ সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথ বাল্মিকী প্রতিভার বাল্মিকী, রাজা ও রানিতে বিক্রমদেব, বৈকুণ্ঠের খাতায় ভেদ্য, অরূপ রতনে ঠাকুরদা, বিসর্জনে রঘুপতি ও জয়সিংহ অচলায়তনে গুরু, ফাল্গুনীতে অন্ধ বাউল, প্রায়শ্চিত্তে ধনঞ্জয় বৈরাগী, ডাকঘরে ঠাকুরদা প্রভৃতি চরিত্র রূপায়ণে যে নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন তাতে দর্শকরা বিমোহিত হয়েছিলেন। কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী বিসর্জন নাটকে রবীন্দ্রনাথের অভিনয় দেখেছিলেন। এই নাটকে রবীন্দ্রনাথ রঘুপতির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। কবি বাগচী রবীন্দ্রনাথের অভিনয় দেখে বিমুগ্ধ হয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমার জীবনের এক অপূর্ব উন্মাদিনী অভিজ্ঞতা, কবির রঘুপতি অভিনয় দেখিয়া আনন্দে ও বিস্ময়ে একেবারে অভিভূত হইয়া গেলাম।’ ১৯২৩ সালে কলকাতার এম্পায়ার থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথ বিসর্জন নাটকে জয় সিংহের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিলো ৬২। এই চরিত্র রূপায়ণে তিনি অসামান্য অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। এই নাটক উপভোগ করে সমালোচক অতীন্দ্র চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৬২ বৎসর কিন্তু তিনি মঞ্চে এমন সহজ নমনীয় ভঙ্গীতে ও সুন্দরভাবে চলাফেরা করতে লাগলেন যে-কেউ ভাবতেও পারে না যে তাঁর অতখানি বয়স হয়েছে। তাঁর ঝুলন্ত শ্মশ্রু চারধারে পাকিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছিলো এবং কালো রং করা হয়েছিলো। অভিনয় চলাকালীন কেউ হাততালি দিল না। কেউ জায়গা ছেড়ে উঠল না বা একটা কথাও বলল না, সমগ্র প্রেক্ষাগৃহ নীরব ও নিশ্চল। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল, দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে শুনছিল।’ তৎকালীন একজন সুগায়িকা সাহানা দেবী। তিনি কবির বিসর্জন নাটকে বেশ কটি গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন। এই নাটকে কবির জয় সিংহের ভূমিকায় অভিনয় দেখে তিনি চমৎকৃত হয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘সে এক অভাবনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। এখানে কবি রবীন্দ্রনাথ আর অভিনেতা রবীন্দ্রনাথ এক হয়ে গেলেন। বড় কবি না হলেও বড় অভিনেতা হতে পারে, অভিনয় ক্ষমতা না থাকলেও বড় কবি হতে পারে। যেখানে এই যুগ্ম প্রতিভার একত্র সমাবেশ সেখানে কী জিনিস সৃষ্টি হতে পারে তা-ই দেখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আর আমরা তা দেখেছিলাম রবীন্দ্রনাথের জয় সিংহের ভূমিকায়।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও রবীন্দ্রনাথ নাটকের ক্ষেত্রে বিচরণ করেছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত গতিতে। ১৯৩৫ সালে কলকাতার কবির রাজা নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিলো। তাঁর বয়স তখন ৭৪ বৎসর। বয়স ভারাক্রান্ত কবি এই নাটকের ঠাকুরদা ভূমিকায় সফল অভিনয় করেছিলেন। এই নাটকে রাজারূপে তিনি নেপথ্য কণ্ঠও দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ অতি যতেœর সাথে নাটকের মহড়া তত্ত্বাবধান করতেন। এমন কি আশি বৎসর বয়সেও তাসের দেশ, শ্যামা প্রভৃতি নাটকের মহড়া তত্ত্বাবধানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। মঞ্চশিল্পী সৃষ্টিতেও রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট পরিশ্রম স্বীকার করেছিলেন। তৎকালীন অনেক অভিনেতা অভিনেত্রী রবীন্দ্রনাথের উৎসাহে মঞ্চে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন শান্তিনিকেতনের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, কর্মচারী, শান্তিদেব ঘোষের ভাষায় উক্ত ক্ষমতা লাভ করে। তিনি লিখেছিলেন, অভিনেতাবর্গকে তৈরি করতে তাঁকে প্রাণপণে দিনের পর দিন খাটতে হয়েছে। তিনি কখনো কোনো পেশাদার অভিনেতা, অভিনেত্রীকে নিয়ে এই কাজে নামেন নি। যেমন ছাত্র-ছাত্রী, অধ্যাপক ও কর্মী শান্তিনিকেতনে এসে সমবেত হয়েছেন। কখনো অভিনয় করার কল্পনাও করেন নিÑতাঁদের নিয়েই তিনি অভিনয় সার্থক করে তুলেছেন। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রের অভিনয় একা তিনি শিখিয়েছেন পাখি পড়ানোর মতো। বহুমুখী ধারায় প্রবাহিত রবীন্দ্রনাথের নাট্যপ্রতিভাকে কোনো যুক্তিতেই অবমূল্যায়ন করার উপায় নেই। তখনকার সময়ের শুধু নয়, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটেও রবীন্দ্র নাথের নাটকগুলো শিল্পের ক্ষেত্রে এক অসামান্য অবদান হিসেবে স্বীকৃতি হয়ে আছে। কবি রবীন্দ্রনাথ যেমন চিরঞ্জীব তেমনি নাট্যজন রবীন্দ্রনাথও।
* বিভিন্ন সূত্র অবলম্বনে















