চট্টগ্রাম শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

মিনি বাংলাদেশ এখন ‘ভূতের বাড়ি’!

জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স

মিনি বাংলাদেশ এখন ‘ভূতের বাড়ি’!

তাসনীম হাসান

২২ আগস্ট, ২০২৬ | ১:০৬ অপরাহ্ণ

জাতীয় সংসদ ভবনের আদলে তৈরি ভবনটি দূর থেকে এখনো চেনা যায়। কিন্তু কাছে গেলেই বদলে যায় সেই চেনা দৃশ্য। দেয়ালে শেওলার আস্তরণ, চারপাশে আগাছা। ভবনের সামনের লেকটির অবস্থা আরও করুণ। একসময় স্বচ্ছ পানিতে প্রতিফলিত হতো স্থাপনাটির অবয়ব। এখন সেখানে পানির চেয়ে শেওলাই যেন বেশি। ঘন সবুজ শেওলা, কচুরিপানা ও ময়লায় লেকটি পরিণত হয়েছে দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত ডোবায়!

 

শুধু জাতীয় সংসদ ভবন নয়, জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সের আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, কার্জন হল, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ছোট সোনা মসজিদ, কান্তজিউ মন্দির ও পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের আদলে তৈরি স্থাপনাগুলোরও একই দশা। আগাছা আর জঙ্গলে অনেক স্থাপনা হারিয়ে যেতে বসেছে। কমপ্লেক্সটিতে সন্ধ্যা নামলেই চারপাশের নীরবতা ভেঙে শুধু শোনা যায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। সবমিলিয়ে ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে গড়ে ওঠা ‘মিনি বাংলাদেশ’ তাই এখন অনেকটাই ভ‚তের বাড়ি। রাতের আঁধার নামতেই শুরু হয় অপরাধীদের আনাগোনা, জিনিসপত্র চুরি।

 

নগরের চান্দগাঁওয়ের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালের বিপরীতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রসংলগ্ন ১৬ দশমিক ৩৭ একর জায়গাজুড়ে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স। ২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট তখনকার প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া এটির উদ্বোধন করেন। এক জায়গায় দেশের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য নিদর্শনের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ তৈরি হওয়ায় এটি পরিচিতি পায় মিনি বাংলাদেশ নামে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’।

 

তালাবদ্ধ পার্ক, নীরব প্রাঙ্গণ: একসময় বিকেল হলেই দর্শনার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে উঠত কমপ্লেক্সটি। শিশুদের কোলাহল, বিনোদন রাইডের শব্দ আর ছোট ট্রেনে চড়ে পুরো পার্ক ঘুরে দেখার আনন্দে প্রাণবন্ত থাকত ১৬ একরের এই প্রাঙ্গণ। এখন সেখানে নেই মানুষের কোলাহল, নেই শিশুদের হাসি। আছে তালাবদ্ধ ফটক, ভাঙা স্থাপনা আর আগাছায় ঢাকা পথ।
ফটক পেরিয়ে কিছু দূর এগোলেই জাতীয় সংসদ ভবনের প্রতিরূপ। একসময় যে স্থাপনাটি দর্শনার্থীদের চোখ আটকে দিত, এখন সেটি দাঁড়িয়ে আছে নিঃসঙ্গ হয়ে।

 

সংসদ ভবন পেরিয়ে এগোতেই স্বাধীনতা টাওয়ার। প্রায় ৭১ মিটার উচ্চতার এই টাওয়ার একসময় ছিল কমপ্লেক্সের অন্যতম আকর্ষণ। ওপরে ছিল ঘূর্ণায়মান রেস্তোরাঁ। সেখান থেকে পুরো শহর, কর্ণফুলী নদীসহ দূরের বিস্তীর্ণ এলাকা দেখা যেত। এখন টাওয়ারটির লিফট অচল। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা কাচ। ওপরে ওঠার সুযোগ নেই। এরপর চোখে পড়ে শিশুদের খেলার জায়গা। একসময় যেখানে ছোটদের ভিড় থাকত, এখন সেখানে আগাছার রাজত্ব। পাশে সেন্ট নিকোলাস চার্চ। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পথও প্রায় হারিয়ে গেছে জঙ্গলের নিচে।

 

বিনোদন রাইডগুলোর দৃশ্য আরও বিষণ্ণ। রোলার কোস্টার, ফেরিস হুইল, মেরি-গো-রাউন্ড, শিশুদের বিভিন্ন রাইড সবকিছুতেই মরিচা। কোথাও খুলে নেওয়া হয়েছে যন্ত্রাংশ। বাম্পার কারের লোহার ছাউনি ভেঙে পড়ে আছে। গাড়িগুলোও পড়ে আছে এলোমেলোভাবে। একসময় যে জায়গায় শিশুদের উচ্ছ্বাস ছিল, সেখানে এখন নীরবতা। বড় কুঠির সামনেও একই দৃশ্য। একসময় এখান থেকে ছোট ট্রেনে চড়ে দর্শনার্থীরা পুরো কমপ্লেক্স ঘুরে দেখতেন। এখন ভবনের দেয়ালে ফাটল ও শেওলা। রেলপথের বড় অংশে নেই লোহার রেললাইন। পড়ে আছে শুধু পাথর। ট্রেন চলাচলের জন্য তৈরি কৃত্রিম সুড়ঙ্গের মুখে জমে আছে পানি। চারপাশে কচুগাছ ও ঝোপঝাড়।

 

জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রতিরূপ ঢেকে গেছে আগাছায়। লালবাগ কেল্লার দেয়ালে ফাটল। কার্জন হলের সামনে ঘন গাছপালা। কান্তজিউ মন্দিরও অনেকটা আড়ালে। আহসান মঞ্জিলের আদলে তৈরি গোলাপি ভবনটাও এখন অচেনা। ছোট সোনা মসজিদের প্রতিরূপেও একই চিত্র। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার প্রায় অদৃশ্য ঘন জঙ্গলের আড়ালে। শহীদ মিনারের গায়েও পড়েছে ভাঙনের দাগ।

 

দুই বছর ধরে বন্ধ: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে কমপ্লেক্সটি বন্ধ। ওই দিন বিক্ষুব্ধ জনতা সেখানে ভাঙচুর চালায়। তখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর ভাই কমপ্লেক্সটি পরিচালনা করতেন। এরপর আর দর্শনার্থীদের জন্য এটি খুলে দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বন্ধ হয়ে যায় নিয়মিত পরিচর্যাও। মানুষের অনুপস্থিতিতে জায়গাটি ধীরে ধীরে দখলে নেয় আগাছা, শেওলা, ঝোপঝাড় আর পোকামাকড়।

 

পুরনো নামে ফিরল, এখন চালুর অপেক্ষা: গত ৬ জুন চট্টগ্রামে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনকালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমদ আযম খান কমপ্লেক্সটির পুরনো নাম ফিরিয়ে আনার কথা বলেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১২ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন শাখার এক প্রজ্ঞাপনে এর নাম পুনরায় জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স করা হয়েছে। কমপ্লেক্সটি চালুর বিষয়ে শুরু থেকেই সক্রিয় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহŸায়ক এরশাদ উল্লাহ। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমাদের দাবির প্রেক্ষিতে কমপ্লেক্সটির নাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

এখন দ্রুত চালুর বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় নষ্ট হওয়া স্থাপনাগুলো সংস্কারে সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। শিগগিরই টেন্ডার দেওয়া হবে। টেন্ডার শেষে সংস্কারকাজ শুরু হবে। সেটি শেষ হলেই জনসাধারণের জন্য কমপ্লেক্সটি খুলে দেওয়া হবে।’

 

একসময় যে প্রাঙ্গণে ইতিহাস, বিনোদন আর স্থাপত্যের মিলন ঘটত, আজ সেখানে কেবল নীরবতা। সংস্কার শেষে দ্রুতই আবার খুলবে ‘মিনি বাংলাদেশের’ বন্ধ ফটক-এই অপেক্ষায় দিন গুনছেন নগরবাসী।

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট