দেশের অর্থনীতি, শিল্প-কারখানা, আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিস। তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও এই খাতে এখনো রয়েছে পেশাগত মর্যাদার সংকট, অপ্রতুল বেতন, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, জনবল ধরে রাখতে না পারা এবং প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘দারোয়ান’ ধারণা থেকে বেরিয়ে প্রাইভেট সিকিউরিটিকে পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে ভবিষ্যতের চাহিদা মোকাবিলা কঠিন হবে।
দৈনিক পূর্বকোণের স্টুডিওতে ‘বাংলাদেশে প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিসের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা উঠে আসে। আলোচনায় অংশ নেন বিজিএমইএর অতিরিক্ত সচিব (অব.) লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন, ও আর নিজাম রোড আবাসিক কল্যাণ সমিতির প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন আতিক ইউ এ খান, ইন্টিমেটস (প্রাইভেট) লিমিটেডের প্রধান মানবসম্পদ প্রশাসক কশফুল হক শেহজাদ এবং সিকিউরিটি থ্রি সিক্সটি লিমিটেডের পরিচালক সাদাত মাসুদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজেকেএস কাউন্সিলর ও সিডিএফএ নির্বাহী সদস্য সাইফুল আলম খান।
আলোচনায় লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন বলেন, নিরাপত্তা শুধু গার্মেন্টস খাতের জন্য নয়, সব শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তৈরি পোশাক খাত সরাসরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এখানে নিরাপত্তার গুরুত্ব আরও বেশি।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশে কোনো কারখানা পরিদর্শনে এসে প্রথমেই যে বিষয়টি দেখেন, তা হলো কারখানার প্রবেশপথ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গেটে থাকা নিরাপত্তাকর্মীর আচরণ ও উপস্থাপনাও বিদেশি ক্রেতার কাছে প্রতিষ্ঠানের প্রথম ধারণা তৈরি করে। এরপর তারা সিসিটিভি, এক্সেস কন্ট্রোল, ফায়ার ডিটেকশন ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
তার মতে, নিরাপত্তায় কোনো ধরনের দুর্বলতা হলে তা শুধু একটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতার আস্থা ধরে রাখতে আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা অপরিহার্য।
ক্যাপ্টেন আতিক ইউ এ খান বলেন, নিরাপত্তা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর একটি। সরকারের পক্ষে প্রতিটি ব্যক্তি বা আবাসিক এলাকার জন্য আলাদাভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই এলাকাভিত্তিক সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন।
তিনি জানান, একটি আবাসিক এলাকায় প্রায় ৫ হাজার মানুষের বসবাস এবং ৫০০টির বেশি বাড়ি রয়েছে। সেখানে প্রায় ১০-১২ বছর ধরে সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু আছে। দিনে প্রায় ৯ জন এবং রাতে ৭ জন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করেন। গেট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তারা পুরো এলাকায় টহল দেন।
তবে তার মতে, নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন, ছুটি ও সুযোগ-সুবিধা যথাযথ না হলে দক্ষ জনবল ধরে রাখা সম্ভব নয়। শুধু কম বেতনে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করিয়ে নিরাপত্তার মান উন্নত করা যাবে না।
সিকিউরিটি থ্রি সিক্সটি লিমিটেডের পরিচালক সাদাত মাসুদ বলেন, এ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ‘প্রফেশনালিজম’। এখনো অনেকেই নিরাপত্তাকর্মীর কাজকে পেশা হিসেবে বিবেচনা করেন না। ফলে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও কর্মীরা কয়েক মাসের মধ্যে অন্য পেশায় চলে যান।
তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রাইভেট সিকিউরিটি খাতে প্রায় ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ মানুষ কাজ করছেন। এত বড় একটি কর্মসংস্থান খাত হলেও নিরাপত্তাকর্মীদের সামাজিক মর্যাদা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
তিনি বলেন, ‘দারোয়ান’ ধারণা থেকে বের হয়ে নিরাপত্তাকর্মীকে একজন প্রশিক্ষিত পেশাজীবী হিসেবে দেখতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগদাতাদেরও তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে।
কশফুল হক শেহজাদ বলেন, নিরাপত্তাকর্মীদের দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে বেতন কাঠামোর পাশাপাশি প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও ছুটির মতো সুযোগ-সুবিধা চালু করা প্রয়োজন। তার মতে, একজন কর্মী যদি পাঁচ বা দশ বছর একই পেশায় থাকার আর্থিক নিশ্চয়তা পান, তাহলে তিনি প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী হবেন এবং নিজের পেশাগত দক্ষতা বাড়াবেন। তিনি বলেন, অনেক নিরাপত্তাকর্মী ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। অথচ তাদের পোশাক, জুতা ও কর্মপরিবেশও অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত নয়। এসব বিষয়েও নজর দেওয়া দরকার।
আলোচনায় উঠে আসে, ভবিষ্যতের নিরাপত্তাব্যবস্থা শুধু জনবলনির্ভর থাকবে না। সিসিটিভি, এক্সেস কন্ট্রোল, ড্রোন, আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা ও থ্রেট অ্যানালাইসিসের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তবে প্রযুক্তি স্থাপন করলেই হবে না; এসব পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। সাদ্দাত মাসুদ জানান, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তারা সিকিউরিটি সার্ভে, থ্রেট অ্যানালাইসিস এবং ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। একটি নিরাপত্তা সমীক্ষার ভিত্তিতে ২০-২৫ পৃষ্ঠার রিপোর্ট তৈরির সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে। লেফটেন্যান্ট কমান্ডার কুতুবউদ্দিন বলেন, শুধু যন্ত্রপাতি আধুনিক করলেই হবে না। ‘মেশিনের পেছনের মানুষটিকেও’ আধুনিক ও প্রশিক্ষিত করতে হবে। শিল্প-কারখানায় নিরাপত্তার মান উন্নয়নে বিজিএমইএ একটি অভিন্ন নিরাপত্তা গাইডলাইন তৈরি করতে পারে বলে মত দেন কুতুবউদ্দিন। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তা সেবা প্রদানকারীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট মানের সেবা নিতে পারবে। একই সঙ্গে প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিস প্রোভাইডারদের সংগঠনকেও আরও শক্তিশালী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
আলোচকরা মনে করেন, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে বাংলাদেশের প্রাইভেট সিকিউরিটি খাতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, উন্নত বেতন কাঠামো, সামাজিক মর্যাদা এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এ খাত একটি সম্মানজনক পেশায় পরিণত হতে পারে।
আতিক ইউ এ খান বলেন, নিরাপত্তাকর্মীদের প্রতি মানবিক আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার অভিজ্ঞতায়, ছুটি, পারিবারিক প্রয়োজনে সহযোগিতা ও সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করলে একজন নিরাপত্তাকর্মী দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী হন।
আলোচকদের অভিন্ন মত— নিরাপত্তাকর্মীকে আর ‘দারোয়ান’ হিসেবে নয়, প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল নিরাপত্তা পেশাজীবী হিসেবে দেখতে হবে। তাহলেই জনবল, প্রযুক্তি ও পেশাগত মর্যাদার সমন্বয়ে বাংলাদেশের প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিস নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে।

















