চট্টগ্রাম বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

স্বেচ্ছায় ডলু নদী খনন দুই কোটি ঘনফুট বালি লুটের পরিকল্পনা

স্বেচ্ছায় ডলু নদী খনন, দুই কোটি ঘনফুট বালি লুটের পরিকল্পনা

নাজিম মুহাম্মদ

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ

স্বেচ্চায় খননের নামে সাতকানিয়ার ডলু নদীর কয়েক কোটি টাকার বালি ও মাটি লুটে নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নদীর সাতকানিয়া অংশের প্রায় ১৭ কিলোমিটার এলাকা স্বেচ্ছায় খননের জন্য একটি ঠিকাদারি সংস্থাকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে বিনামূল্যে।

 

 

অনুমোদন পত্রে বলা হয়েছে, নদী থেকে মাটি ও বালি উত্তোলনের কাজ তদারকি করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে স্বেচ্ছায় নদী খননের কাজে আমাদের তদারকি করার কোন এখতিয়ার নেই। তাছাড়া নদীর মাটি ও বালি খনন করতে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম রয়েছে। মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষা ছাড়া নদী খনন করা সম্ভব নয়। ডলু নদীর ক্ষেত্রে সমীক্ষা হয়েছে কি না আমরা জানি না।

 

 

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, বিষয়টি এ মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না। খোঁজ নিয়ে জানতে হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলছে, বৃষ্টি কমলেই আমরা ডলুর মাটি ও বালি উত্তোলনের কাজ শুরু করবো। নদীর মাটি ও বালি উত্তোলনের অনুমোদন দিয়েছেন সাতকানিয়ার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান। তিনি জানান, যেদিন ডলু খালের মাটি ও বালি খননের অনুমোদন পত্র দেয়া হয়েছে সেদিনই অনুমোদনটি বাতিল করা হয়েছে।

 

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, চাইলেই যে কেউ খাল বা নদী খনন করতে পারে না। তাছাড়া ডলু নদীর সাতকানিয়া অংশে যে পরিমাণ বালি রয়েছে তা কয়েক কোটি টাকা মূল্যের। শঙ্খ নদীর বালি উত্তোলন করে আমরা সরকারি কোষাগারে ৫ কোটি টাকা রাজস্ব জমা করেছিলাম। জানা যায়, স্বেচ্ছায় খাল খননের জন্য চলতি বছরের ১১ মে ভূমি মন্ত্রণালয় একটি পরিপত্র জারি করে। পরিপত্রে বলা হয়েছে, দেশব্যাপী খাল খনন সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচির একটি অংশ। দীর্ঘ সময় ধরে খনন না করায় এবং কিছু অংশ বেদখলের কারণে দেশের অধিকাংশ খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় খালগুলির নাব্যতা হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে স্থানে স্থানে জলাবদ্ধতা জনজীবনে দুর্ভোগ বৃদ্ধি করছে।

 

 

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর খনন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তা সত্ত্বেও অনেক খাল বিশেষ করে ছোট খালগুলি নিয়মিত খননের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। স্বেচ্ছাশ্রম বা ব্যক্তি উদ্যোগে খাল হতে মাটি ও বালি আহরণ সহজ করতে পরিপত্রে নয়টি নির্দেশনা দেয়া হয়। তাতে স্বেচ্ছাশ্রমে নিজ ব্যয়ে খাল খনন, দরখাস্ত নেয়ার আগেই খালের সমীক্ষা করা, বড় খাল একের অধিক ব্যক্তিকে দেয়া, কতফুট দূরে মাটি সরিয়ে নিতে হবে ইত্যাদি নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।

 

 

এ পরিপত্রের সুযোগে গত আগস্ট মাসে বদলি হওয়া সাতকানিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান ডলু নদী থেকে স্বেচ্ছায় মাটি ও বালি উত্তোলনের অনুমতি পত্র দেন মেসার্স করিম এন্ড ব্রাদার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। গত ২৩ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বদলি আদেশ হলেও তিনি অনুমতি পত্র দেন ২৭ আগস্ট। অনুমতি পত্রে বলা হয়েছে, সাতকানিয়া উপজেলার ডলু খালের গারাঙ্গিয়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা হতে উত্তরে ভাটির দিকে নলুয়া আমিলাইষ তিন খালের মুখ পর্যন্ত জেগে উঠা মাটির ডিভি, বালির ডিভি খননের সম্ভাব্যতা যাছাইপূর্বক সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বিগত ১৪ জুন গঠিত ‘স্বেচ্ছায় উপজেলা খাল খনন কর্মসূচি কমিটি’কে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। উক্ত কমিটির আহ্বায়ক ও উপজেলা প্রকৌশলী এ বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত করে কমিটির পক্ষে গত ২৫ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিল করেন। ডলু খালের গারাঙ্গিয়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা হতে উত্তরে ভাটির দিকে নলুয়া আমিলাইষ তিন খালের মুখ পর্যন্ত জেগে উঠা মাটি ও বালির ডিভি টোটাল স্টেশন মেশিন হতে তথ্যের আলোকে অপসারণযোগ্য মাটির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখিত অংশে মাটির পরিমাণ এক কোটি ৮৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৩ ঘনফুট।

 

 

 

অনুমতি পত্রে বলা হয়েছে, নির্ধারিত চেইনে থাকা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিরক্ষা কাজ অংশে খনন করা যাবে না। সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। খালে দুই পাশে থাকা সরকারি স্থাপনার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে হবে। ডিজাইনের বাইরে খাল খনন করা যাবে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড সময়ে সময়ে খনন কাজ তদারকি করবেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবরে দাখিল করবেন।

 

 

জানতে চাইলে স্বেচ্ছায় উপজেলা খাল খনন কর্মসূচির আহ্বায়ক সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে জানান, আমরা গারাঙ্গিয়া থেকে এওচিয়া পর্যন্ত আনুমানিক ছয় কিলোমিটার খালের এলাকা পরিদর্শন করেছি। আমিলাইষ পর্যন্ত পুরো নদী পরিদর্শন করতে পারিনি। যতটুকু এলাকা পরিদর্শন করেছি সেখানকার মাটি উত্তোলনের জন্য বলেছি প্রতিবেদনে।

 

 

মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ জানান, হঠাৎ করে নদীর বালু পরিমাপ করা যায় না। নদী বা খাল ড্রেজিং করার আলাদা নিয়ম রয়েছে। খাল খনন তদারিক জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডে আলাদা ডিজাইন বিভাগ রয়েছে। তাছাড়া ডলু খালের খননের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যে অনুমোদন দিয়েছেন সেখানে আমাদের কাজ করার কোন সুযোগ নেই।

 

জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স করিম এন্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী আবদুল করিম জানান, অনুমোদনের বাতিলের কোন চিঠি আমরা পায়নি। বৃষ্টি কমলেই আমরা ডলু নদী খননের কাজ শুরু করবো।

 

 

খননের জন্য স্থানীয়ভাবে কাউকে সাব ঠিকাদারি দেয়া হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে আবদুল করিম জানান, সাব ঠিকাদারি দেয়ার কোন সুযোগ নেই।

 

 

ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম ছিল নৌপথ। সে সময়ে ডলু নদী একটি আন্তর্জাতিক নৌরুটের অংশ ছিল। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত সাতকানিয়ার মানুষ এই নদী পথেই প্রতিদিন চট্টগ্রাম শহরে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন করতেন। তৎকালীন সময়ে ভারতের কলকাতা এবং পাকিস্তানের করাচি থেকে বিভিন্ন কাপড় ও পণ্যসামগ্রী নৌকাযোগে এই ডলু নদী হয়েই সাতকানিয়ার স্থানীয় বাজারে আসত। এমনকি মিয়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) সাথেও ডলু নদীর মাধ্যমে নৌ-বাণিজ্য পরিচালিত হতো। নদীটিকে কেন্দ্র করে সাতকানিয়া সদরে জমজমাট ব্যবসা-বাণিজ্য ও হাট-বাজার গড়ে ওঠে।

 

পূর্বকোণ/আদর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট