চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

সুপার এল নিনোর প্রভাবে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর শঙ্কা

বাংলাদেশে প্রাণ হারাতে পারে ৬০০

সুপার এল নিনোর প্রভাবে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর শঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ২:০৭ অপরাহ্ণ

জলবায়ু বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, শক্তিশালী সুপার এল নিনো বা ‘গডজিলা এল নিনো’র ফলে প্রভাবে সৃষ্ট অতিরিক্ত গরমের কারণে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির বাংলাদেশে অতিরিক্ত গরমের কারণে ৬০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আর এই ছয় মাসে অতিরিক্ত গরমের কারণে বিশ্বজুড়ে মৃত্যু হতে পারে সাড়ে ৪ লাখেরও বেশি মানুষের। এছাড়া এল নিনোর কারণে সৃষ্ট খরা, দাবানল ও বন্যার ফলে আরও অনেক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।

 

বর্তমানে যে এল নিনো পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে তুলছে, তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর কয়েক মাস আগেই গত সোমবার অতীতের সব তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এবারের তাপমাত্রার মাত্রা আগের ঘটনাগুলোর তুলনায় এতটাই বেশি যে বিজ্ঞানীরা একে ‘অবিশ্বাস্য’ এবং ‘গডজিলা-পর্যায়ের’ এল নিনো বলে আখ্যায়িত করেছেন।

 

‘গডজিলা’ এল নিনোর এই প্রভাব বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বেশি তীব্র হতে পারে। খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম উষ্ণতাজনিত মৃত্যুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব-এর তথ্যমতে, এই ছয় মাস সময়ে শুধুমাত্র খুলনাতেই গরমে অতিরিক্ত প্রায় ৩১০ জনের মৃত্যু হতে পারে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যখন এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে, সেই সময় এই মূল্যায়ন সামনে এল।

 

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাব বজায় থাকার অত্যন্ত প্রবল আশঙ্কা প্রায় ১০০ শতাংশ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের শেষের দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ ধারণ করবে। এর ফলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে; বেড়ে যেতে পারে তীব্র গরম, খরা ও বন্যার ঝুঁকি। তবে এল নিনো সব জায়গায় সমান প্রভাব ফেলে না। এর স্থানীয় প্রভাব ভৌগোলিক অবস্থান, ঋতু ও অন্যান্য জলবায়ুগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

 

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-নভেম্বর সময়কালের পূর্বাভাসে বিশ্বের অধিকাংশ স্থলভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকার প্রবল আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব আঞ্চলিক পর্যায়ে উষ্ণতাজনিত মৃত্যুর হিসাব করে, যা গবেষকদের এমন সব এলাকা চিহ্নিত করতে সহায়তা করে যেখানে তীব্র তাপমাত্রার ফলে মানবিক বিপর্যয় সবচেয়ে মারাত্মক হতে পারে।

 

বাংলাদেশে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম উল্লেখযোগ্যভাবে অতিরিক্ত তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ছয় মাসে বাংলাদেশে প্রায় ৬০০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যুর যে হিসাব করা হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৩১০ জনই খুলনার। এগুলো মডেলের মাধ্যমে নিরূপিত অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা, বাস্তবে পর্যবেক্ষণ করা প্রাণহানি নয়। এল নিনো চলাকালীন প্রত্যাশিত তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত অতিরিক্ত মৃত্যুর হার পরিমাপ করে এই হিসাব তৈরি করা হয়েছে।

 

তাপদাহ সবার ওপর সমান প্রভাব ফেলে না। বাইরে কর্মরত শ্রমিক, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের শীতল পরিবেশে থাকার ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত, চরম তাপমাত্রার সময় তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারেন। উন্নত তাপমাত্রার পূর্বাভাস, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বাইরে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষার মতো পদক্ষেপগুলো চরম তাপমাত্রার সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে এসব ঝুঁকিগুলো কেবল তাপমাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

 

শক্তিশালী এল নিনো বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে। এতে কিছু এলাকায় যেমন খরা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, তেমনি অন্যান্য এলাকায় ভারি বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের পরিবর্তন কৃষি, পানি সরবরাহ ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, যেসব জনগোষ্ঠী ইতিমধ্যেই তীব্র তাপমাত্রা ও জলবায়ু-সংক্রান্ত অন্যান্য দুর্যোগের সম্মুখীন, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও নতুন ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে।

 

বিশ্বজুড়ে সাড়ে চার লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু : বাংলাদেশে প্রাণহানির এই প্রাক্কলিত হিসাব বৃহত্তর বৈশ্বিক পরিস্থিতির অংশ। গবেষকদের তথ্যমতে, বর্তমান এল নিনো চলাকালীন বিশ্বজুড়ে তাপজনিত কারণে সাড়ে ৪ লাখেরও বেশি অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিল। সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে গরমের কারণে অতিরিক্ত ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

এর মধ্যে নাইজেরিয়াতে ৩১ হাজার ৪০০, সুদানে সাড়ে ১৭ হাজার, নাইজারে ১০ হাজার ও শাদে ৮ হাজার মানুষের মৃত্যুর পূর্বাভাস রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া মিলিয়ে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার ৪০০। শুধু ইন্দোনেশিয়াতেই তাপমাত্রার কারণে অতিরিক্ত ১৯ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। অন্যদিকে ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ জন ও ব্রাজিলে ১৩ ৩০০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে তাপদাহজনিত কারণে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট