চট্টগ্রাম রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

চট্টগ্রামের আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামেই কি বিস্মৃত?

আজ অমর শিল্পীর চলে যাওয়ার দিন

চট্টগ্রামের আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামেই কি বিস্মৃত?

তাসনীম হাসান 

১৮ অক্টোবর, ২০২৬ | ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ

ঝরাপাতার উড়াউড়ি। হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো পুরোনো পাতার মতোই বিবর্ণ কবরটি। নামফলক নেই, নেই জাঁকজমক। অথচ এখানে শুয়ে আছেন এমন একজন, যাঁর গিটারের সুরে একসময় ঝড় উঠত, যাঁর কণ্ঠে প্রেম, বিরহ আর অভিমানের গল্প খুঁজে পেত হাজারো মানুষ। যে আঙুলের ছোঁয়ায় গিটারের তারে সৃষ্টি হয়েছিল নিজস্ব এক সংগীতভাষা, তা আজ নিথর। চট্টগ্রামের চৈতন্য গলি বাইশ মহল্লা কবরস্থানের গাছের ছায়ায় চিরঘুমে আছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত গিটারবাদক ও ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ আইয়ুব বাচ্চু।
 
আজ তাঁর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর থেমে গিয়েছিল তাঁর হৃদস্পন্দন। কিন্তু থামেনি গান। ‘সেই তুমি’, ‘রূপালী গিটার’ কিংবা ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’ আজও ফিরে ফিরে আসে শ্রোতার কাছে। অথচ যে শহরের আলো-বাতাসে কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর, সেই চট্টগ্রামেই তাঁর শেষ ঠিকানাটি পড়ে আছে অনেকটা নিভৃতে।
 
গানের জগতে অমর, কবরের পাশে নীরবতা- এই বৈপরীত্যই প্রশ্ন তোলে যে শিল্পীর সুর এত মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে, তাঁর স্মৃতি আগলে রাখতে জন্মশহরের উদ্যোগ কতটা দৃশ্যমান?
 
গত সাতটি মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে কবরের নীরবতা নিয়ে আক্ষেপ ছিল ভক্তদের মধ্যে। এবার অবশ্য স্মরণ আয়োজনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত আইয়ুব বাচ্চু স্মৃতি সংসদ এবং ভক্তদের সংগঠন এবি ফ্যান ক্লাব নিয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি। তবে আনুষ্ঠানিক আয়োজনের বাইরেও প্রশ্ন থেকে যায়- শিল্পীর স্মৃতি ধরে রাখতে স্থায়ী উদ্যোগ কতটা এগোবে?
 
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট জন্ম আইয়ুব বাচ্চুর। পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের পটিয়ার খরনা গ্রামে। বেড়ে ওঠা বন্দরনগরীতে। এই শহরের অলিগলি আর কৈশোরের দিনগুলো পেছনে ফেলে আশির দশকে সংগীতের স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমান ঢাকায়। সোলস ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিচিতি পান। পরে গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড লাভ রানস ব্লাইন্ড-এলআরবি। গিটারবাদনের স্বতন্ত্র শৈলী, আবেগময় কণ্ঠ আর মঞ্চ মাতানো উপস্থিতি তাঁকে এনে দেয় ব্যাপক জনপ্রিয়তা। চার দশকের সংগীতজীবনে বাংলা ব্যান্ড সংগীতে গড়ে তোলেন নিজস্ব অবস্থান। সংগীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালে মরণোত্তর একুশে পদক পেয়েছেন তিনি।
 
খ্যাতি ও সংগীতের ব্যস্ততা আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে গিয়েছিল রাজধানীতে, ছড়িয়ে দিয়েছিল দেশ-বিদেশে। তবু চট্টগ্রামের সঙ্গে বন্ধন অটুট ছিল। কনসার্টের ফাঁকে অবসর মিললেই ফিরতেন প্রিয় শহরে। আর ফিরেই ছুটতেন মায়ের কবরের কাছে। সেই মায়ের পাশেই আজ তাঁর নিজের চিরস্থায়ী ঠিকানা।
 
ঢাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার দুদিন পর ২০ অক্টোবর, তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় চট্টগ্রামে। যে শহর থেকে একদিন স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু, মৃত্যুর পর সেই শহরেই ফিরে আসেন তিনি- কাঠের কফিনে।
 
আইয়ুব বাচ্চুর ফুফাতো ভাই ও স্মৃতি সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক মো. হামিদ হোসাইন বলেন, ‘এবার বড় পরিসরে মৃত্যুবার্ষিকী পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রয়েছে শ্রদ্ধাঞ্জলি, জিয়ারত ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন। স্মৃতি ধরে রাখতে ফিরিঙ্গিবাজার থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়কটি আইয়ুব বাচ্চুর নামে করার জন্য মেয়রের সঙ্গে কথা বলেছি। আশা করছি, এই স্বীকৃতি মিলবে।’
 
আইয়ুব বাচ্চুর জীবদ্দশায় তাঁর কয়েকজন ভক্তের উদ্যোগে গড়ে ওঠে এবি ফ্যান ক্লাব। সংগঠনটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘১৯৯১ সাল থেকে বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। ২০১৭ সালে আইয়ুব বাচ্চু নিজেই সংগঠনটির প্রাথমিক কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন। তবে এর বিস্তার দেখে যেতে পারেননি। বর্তমানে বিশ্বের ৪২টি দেশে সংগঠনটির কমিটি রয়েছে। বাচ্চু ভাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণে সবসময় কাজ করে যেতে চাই।’
 
কিন্তু স্মৃতি সংরক্ষণের প্রশ্নটি কেবল মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়। আইয়ুব বাচ্চুর ভক্ত শামসুল ইসলাম বলেন, ‘বাচ্চু ভাইয়ের স্মৃতিতে প্রবর্তক মোড়ে ‘রূপালী গিটার’ নামে একটি প্রতীকী ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সেটি সারাবছরই পোস্টার-ব্যানারের জঞ্জালে ঘেরা। তাঁর স্মৃতি রক্ষায় বড় কোনো স্থাপনা কিংবা সড়কের নামকরণ করা হোক। কেননা তাঁর নামে একটি সড়ক কিংবা সংগীতজীবন তুলে ধরার উদ্যোগ কেবল শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেরও অংশ।’
 
শামসুল ইসলামের এই আক্ষেপেই যেন উঠে আসে পুরো চিত্র। যে শহরের একজন শিল্পী গিটারের সুরে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন, সেই শহরেই তাঁর স্মৃতিচিহ্ন যদি আড়ালে পড়ে থাকে, তবে স্মরণ আয়োজনের পাশাপাশি স্থায়ী উদ্যোগও জরুরি। 
 
আইয়ুব বাচ্চু তাঁর গিটারের সুরে চট্টগ্রামকে ছড়িয়ে দিয়েছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীতে এখন দেখার, চট্টগ্রাম তাঁর স্মৃতিকে কতটা আপন করে নেয়। শিল্পীর গান তাঁকে অমর করেছে, এবার তাঁর স্মৃতিকে মর্যাদা দেওয়ার পালা জন্মশহরের!
 
পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট