একসময় চট্টগ্রামের সকাল ছিল অনেকটাই অন্যরকম। ভোর হতে না হতেই নগরবাসী কর্মস্থলের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়তেন। তখনও শহর ছিল ব্যস্ত, তখনও ছিল জনজট, যানজট ও নানা নাগরিক সমস্যা। কিন্তু দিনের শুরুতে রাস্তা ও ফুটপাতের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আজকের মতো এতটা হতাশা ছিল না। রাতের আবর্জনা সরিয়ে ভোরের শহরকে দিনের জন্য প্রস্তুত করার একটি নিয়মিত ব্যবস্থা ছিল-অন্তত তার দৃশ্যমানতা ছিল।
নব্বই দশকের শুরুর দিকের সেই চিত্র অনেকটাই এখন বদলে গেছে। ভোরের আলো ফুটতেই নগরের বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাতে চোখে পড়ে জমে থাকা আবর্জনা, ধুলাবালি, নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। কোথাও রাতভর পড়ে থাকা বর্জ্য, কোথাও দোকানপাটের ময়লা, আবার কোথাও নালা-নর্দমা থেকে উঠে আসা আবর্জনা পথচারীদের চলাচলও কঠিন করে তোলে। একটি মহানগরের দিন শুরু হওয়ার কথা পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে; অথচ চট্টগ্রামের অনেক এলাকার বাস্তবতা তার বিপরীত।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ সূত্র মতে, চট্টগ্রামের ৪১টি ওয়ার্ডে কর্মরত পরিচ্ছন্নতা কর্মী রয়েছে ৮শ’। আর ডোর টু ডোর প্রকল্পের কর্মী সংখ্যা ১৯শ। এছাড়া নালা পরিষ্কারের জন্য রয়েছে ৪শ’ কর্মী, স্প্রে ম্যান ২শ’। তাদেরকে তদারকির জন্য রয়েছেন ৮২ জন সুপারভাইজার, ৭ জন জোন কর্মকর্তা ও ৭ জন তত্ত্বাবধায়ক। এত কর্মী নিয়োজিত থাকার পরও প্রশ্ন উঠেছে- ন্যূনতম পরিচ্ছন্ন সেবা থেকে নাগরিকগণ বঞ্চিত হবে কেন? যেখানে নগরবাসী নিয়মিত কর ও বিভিন্ন নাগরিক ফি পরিশোধ করে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী করা হবে- এই কথা আমরা শুনে আসছি যুগের পর যুগ। কখনো বলা হয়েছে ‘পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগর’, কখনো ‘সুস্থ ও সুন্দর নগর’, আবার কখনো সিঙ্গাপুরের আদলে আধুনিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। প্রতিশ্রুতির তালিকা দীর্ঘ হয়েছে, কিন্তু নগরবাসীর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা সেই স্বপ্নের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে আজ চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে এক ধরনের বিরক্তি ও হতাশা তৈরি হয়েছে। তারা আর নতুন কোনো স্লোগান শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় কাজের ফল।
পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশন- চট্টগ্রামের নগর প্রশাসনের কাঠামো বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। নগরের পরিধি বেড়েছে, জনসংখ্যা বেড়েছে, রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বেড়েছে, নাগরিক সেবার চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে নিয়মিত ও দৃশ্যমান সেবার মান কতটা বেড়েছে- সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা দরকার: পরিচ্ছন্নতা কোনো উৎসবের আয়োজন নয়, কোনো বিশেষ অভিযানের বিষয়ও নয়; এটি প্রতিদিনের নাগরিক সেবা।
কোনো বিশেষ দিবসকে সামনে রেখে, গুরুত্বপূর্ণ অতিথির আগমন উপলক্ষে কিংবা গণমাধ্যমে সমালোচনা হওয়ার পর হঠাৎ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করে একটি মহানগরকে দীর্ঘমেয়াদে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের অভিযান দিয়ে যে পরিচ্ছন্নতার ছবি তৈরি হয়, তা টেকসই হয় না। প্রয়োজন একটি স্থায়ী, নিয়মতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিনের পরিচ্ছন্নতার জন্য সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। কোন সড়ক কখন পরিষ্কার হবে, কোন ফুটপাত কখন পরিষ্কার করা হবে, কোথা থেকে কখন বর্জ্য সংগ্রহ করা হবে, এসবের নির্দিষ্ট সময়সূচি থাকতে হবে। শুধু কর্মী নিয়োগ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাদের কাজ যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারক করাও জরুরি। প্রয়োজনে প্রতিটি ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের দায়িত্ব ও অগ্রগতি প্রকাশ্যে জানানো যেতে পারে। কোথায় কতজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করছেন, কোন এলাকায় কতবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ হচ্ছে এবং অভিযোগ পাওয়ার পর কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে- এসবের একটি স্বচ্ছ হিসাব থাকলে নাগরিকদের আস্থাও বাড়বে, কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে।
এর পাশাপাশি ফুটপাতকে পথচারীদের জন্য ফিরিয়ে দিতে হবে। আবর্জনা, অবৈধ দখল, নির্মাণসামগ্রী কিংবা ব্যবসায়িক বর্জ্যের কারণে একজন মানুষকে যদি ফুটপাত ছেড়ে ব্যস্ত সড়কে হাঁটতে হয়, তাহলে সেটি শুধু অপরিচ্ছন্নতার সমস্যা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। অবশ্যই নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা, দোকানের বর্জ্য রাস্তায় ফেলে রাখা কিংবা নির্ধারিত সময়ের বাইরে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার জন্য সিটি করপোরেশনকেও নিয়মিত, সহজলভ্য ও নির্ভরযোগ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। নাগরিক শৃঙ্খলা ও কর্তৃপক্ষের সেবা- দুটিই একে অপরের পরিপূরক।
চট্টগ্রামকে সিঙ্গাপুরের মতো করার স্বপ্ন দেখাতে দোষ নেই। বড় স্বপ্ন অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু একটি শহরের উন্নয়নের প্রথম পরিচয় তার সুউচ্চ ভবন, উড়ালসড়ক কিংবা বড় বড় প্রকল্প নয়। একজন সাধারণ নাগরিক সকালে ঘর থেকে বের হয়ে পরিষ্কার রাস্তা ও পরিচ্ছন্ন ফুটপাত দেখতে পাচ্ছেন কি না- উন্নত নগরজীবনের প্রথম পরীক্ষা সেখানেই। চট্টগ্রামবাসী বহু বছর ধরে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হওয়ার প্রতিশ্রুতি শুনে আসছে। এখন তারা প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা এমন একটি শহর চায়, যেখানে দিনের শুরু হবে পরিচ্ছন্নতায়, চলাচল হবে স্বাচ্ছন্দ্যে এবং নগরবাসী নিজের শহর নিয়ে গর্ব করতে পারবে।
চট্টগ্রামের সকালকে আবার পরিচ্ছন্ন করতে হবে। এ জন্য নতুন কোনো স্লোগানের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ নগর ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত জনবল, নিয়মিত তদারকি এবং দায়িত্ব পালনে দৃঢ়তা। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অভিযাননির্ভর পরিচ্ছন্নতার পরিবর্তে প্রতিদিনের পরিচ্ছন্নতাকে নগর প্রশাসনের অপরিহার্য দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
চট্টগ্রামবাসী অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছে। এখন সময় প্রতিশ্রুতির হিসাব দেওয়ার। সকালের চট্টগ্রাম কেমন হবে- তার উত্তর স্লোগানে নয়, প্রতিদিনের পরিচ্ছন্ন রাস্তায় দৃশ্যমান হওয়া উচিত।


















