বৃহস্পতিবার, রাত পৌনে আটটা। পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পরিবার নিয়ে বোয়ালখালী শ্রীপুর গ্রামে বাড়ি যাচ্ছিলেন প্রকাশ পাল। কানুনগোপাড়া পর্যন্ত জনপ্রতি ট্যাক্সি ভাড়া হাঁকালেন একশ টাকা। আর বাড়ি পর্যন্ত রিজার্ভ চাইলেন ৫০০ টাকা। তিনি বললেন, ‘শ্রীপুর পর্যন্ত রিজার্ভে ২৫০-৩০০ টাকা ও কানুনগোপাড়া পর্যন্ত লোকাল ৫০ টাকা ভাড়ায় বাড়ি যেতাম। বৃহস্পতিবারে ভাড়া দ্বিগুণ বেড়ে যায়। মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে। টেম্পো-ট্যাক্সিচালকদের কাছে বোয়ালখালীবাসী জিম্মি হয়ে পড়েছেন।’
বৃহস্পতিবারের এই অবর্ণনীয় দুর্ভোগের গল্প শুধু একজন প্রকাশ পালের নয়, শত শত যাত্রীর। প্রতি বিষ্যুৎবারে কাপ্তাই রাস্তার মাথায় ঘরেফেরা যাত্রীদের চাপ বেড়ে যায়। চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সেই সুযোগে চলে ভাড়া নৈরাজ্য। ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করেন ট্যাক্সি-টেম্পোচালকেরা। মগের মুল্লুকের মতো ভাড়া দ্বিগুণ নেওয়া হয়। কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে যাতায়াত করেন বোয়ালখালী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও কাপ্তাই উপজেলার মানুষ। চার উপজেলার বাসিন্দাদের জন্য বৃহস্পতিবারে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ-দুর্দশা।
বোয়ালখালী: বোয়ালখালী রুটে বাস-মিনিবাসের মতো বড় গণপরিবহন নেই। সিএনজি ট্যাক্সি ও টেম্পোর মতো ছোট যানবাহনই হচ্ছে বোয়ালখালীর একমাত্র ভরসা। বন্ধের আগের দিন ও বৃহস্পতিবার ছোট এসব যানবাহন নিয়ে চলে লুকোচুরি খেলা। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব ছোট যানবাহন নিয়ে টোকেনের নামে বড় চাঁদাবাজি চলে। শ্রমিক নেতা, পুলিশ ও ভূঁইফোড় সাংবাদিকেরা এই টোকেন বাণিজ্য চালিয়ে আসছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর (বুধবার) বোয়ালখালী রুটে টেম্পো ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। উপজেলা প্রশাসন, টেম্পো শ্রমিক নেতা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। তবে এটাকে শুভংকরের ফাঁকি বলে অভিহিত করেছেন বোয়ালখালীবাসী। কৌশলে বাড়তি ভাড়াকে জায়েজ করা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৩-৪ বছর আগে গোমদণ্ডী ফুলতল থেকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা পর্যন্ত টেম্পো ভাড়া ছিল ১০ টাকা। পরে কয়েক দফায় বাড়িয়ে ১২-১৫ টাকা করা হয়। এখন আরও বাড়িয়ে ২০ টাকা করা হয়। কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে কানুনগোপাড়া ও মিলিটারি পুল পর্যন্ত টেম্পো চলাচল করে। শ্রমিকদের মারপ্যাচের ফাঁদের পরে প্রতিটি স্থানে অতিরিক্ত ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।
টোকেনবাজি ও বাড়তি ভাড়ার অভিযোগে বোয়ালখালী রুটে প্রায় দেড় মাস ট্যাক্সি-টেম্পো চলাচল অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ ছিল। যানবাহন সংকটে দুর্ভোগ-দুর্দশা ভোগ করেছিল বোয়ালখালীবাসী। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ’র সহায়তায় টেম্পো চলাচল শুরু হয়। কিন্তু টেম্পো সার্ভিস চালু হওয়ার পর থেকে ভাড়া নিয়ে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ হয়ে পড়ে।
কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে বোয়ালখালী ছাড়াও উত্তরের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও কাপ্তাই উপজেলায় বাস-মিনিবাস, ট্যাক্সি সার্ভিস চালু রয়েছে।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি বৃহস্পতিবারে কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে উত্তরের তিন উপজেলায় ভাড়া নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। বাস ভাড়া তেমন না বাড়লেও ট্যাক্সি ভাড়া রীতিমতো দ্বিগুণ বাড়তি আদায় করা হয়।
কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে রাউজান নোয়াপাড়া পর্যন্ত ট্যাক্সি ভাড়া ৩০ টাকা ও পাহাড়তলী ৪০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার নোয়াপাড়া ৪০-৬০ টাকা এবং পাহাড়তলী পর্যন্ত ৬০ টাকা আদায় করা হয়।
একইভাবে রাঙ্গুনিয়া রুটেও একই অবস্থা। বাস টার্মিনাল ও সিনেমা প্যালেস থেকে কাপ্তাই পর্যন্ত বাস সার্ভিস রয়েছে। টার্মিনাল থেকে চন্দ্রঘোনা পর্যন্ত বাস ভাড়া নেওয়া হয় ৭০-৮০ টাকা। আর সিনেমা প্যালেস থেকে চন্দ্রঘোনা পর্যন্ত এসি বাসে ভাড়া নেওয়া হয় ১৫০ টাকা। কিন্তু কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্যাক্সিতে চলে ভাড়া নৈরাজ্য। প্রতি বৃহস্পতিবার ভাড়া জনপ্রতি ১৫০-২০০ টাকা আদায় করা হয়। সপ্তাহের অন্য দিনে আদায় করা হয় এক শ টাকা করে।
শাহ আমানত সেতুর গোলচত্বরে যত গোলমাল
নিজস্ব সংবাদদাতা, বাঁশখালী জানান, নগরীর শাহ আমানত সেতুর গোলচত্বরে যানজট যেন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। গোলচত্বর ঘিরে অবৈধ দোকান, ভাসমান টংদোকান ও যানবাহনের স্ট্যান্ড গড়ে উঠায় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। শুরু হয় ভাড়া নৈরাজ্য। নগরীর শাহ আমানত গোল চত্বর ও মইজ্জারটেক থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান রুটে বড় যানবাহন চলাচল করে। বৃহস্পতিবার যানবাহন সংকট সৃষ্টি করে মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই রাত পর্যন্ত মানুষের চাপ বেড়ে যায়। লেগে যায় যানজট। বাঁশখালী বাসমালিক সমিতির সদস্যরা জানান, দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, পেকুয়া আঞ্চলিক মহাসড়কে (পিএবি) প্রতিদিন অন্তত ৩৫০ থেকে ৩৭০ টি বাস চলাচল করে। এছাড়াও সিএনজি অটোরিকশা মইজ্জ্যাটেক পর্যন্ত চলাচল করে।
বাঁশখালীর ব্যাংকার আলী হায়দার বলেন, প্রতি বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট পৌঁছতে ব্রিজের উপর অনেক সময় ঘণ্টা পার হয়ে যায়। তীব্র যানজট থাকলেও ট্রাফিক বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দেখা যায় না। অনেক সময় হাজার হাজার যাত্রী হেঁটে সেতু পারাপার হতে হয়। বাসচালক মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, প্রতি বৃহস্পতিবার যাত্রীর চাপ বেশি থাকে। মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে বাড়ি যায়। মানুষের চাপ বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
মানুষের চাপ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে বেড়ে যায় ভাড়া নৈরাজ্যও। সেতুর গোল চত্বর থেকে বাঁশখালীতে বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। বৃহস্পতিবার বাসের ভাড়া জনপ্রতি ২০-৩০ টাকা বেড়ে যায়। আর মইজ্জ্যার টেক থেকে চলাচল করা ট্যাক্সি ভাড়া দ্বিগুণ বেড়ে যায়। মইজ্জ্যার টেক থেকে বাঁশখালীর গুণাগরী পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং জলদী পর্যন্ত ১০০ টাকার ভাড়া ২০০ পর্যন্ত আদায় করা হয়। পটিয়া রুটেও চলাচল করা বাস-মিনিবাস ভাড়া জনপ্রতি ৩০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি আদায় করা হয়।
পূর্বকোণ/নুসরাত

















