চট্টগ্রাম বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

এডিটর্স চয়েস

সম্ভাবনার এক অনন্য মুহূর্ত

ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রধানমন্ত্রীর সফর

ডা. খন্দকার এ কে আজাদ

১৫ জুলাই, ২০২৬ | ৭:২০ পূর্বাহ্ণ

অভিমত

বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষার ইতিহাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি ঐতিহ্য, একটি স্বপ্নের নাম। দেশের অসংখ্য চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক ও স্বাস্থ্যনেতার জন্ম এই প্রতিষ্ঠান থেকে। অতি সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ সফর ছিল নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বিশেষ তাৎপর্য বহন করে এই কারণে যে, তাঁর সহধর্মিণীও এই প্রতিষ্ঠানের একজন কৃতী প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও চিকিৎসক। স্বাভাবিকভাবেই এই সফরকে ঘিরে দেশের চিকিৎসক সমাজের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি।

 

সভায় চিকিৎসক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্তরিক মতবিনিময় হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিক ও ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দীর্ঘ সময় উপস্থিত ছিলেন এবং ধৈর্যসহকারে সবার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তাই এটি ছিল একটি বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ, যেখানে তাৎক্ষণিক সমস্যা ও অর্জনের পাশাপাশি আগামী ১০-২০ বছরের চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর নিয়ে আলোচনা করার একটি অনন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।

 

বর্তমানে বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থা দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর ও গবেষণাভিত্তিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল হাসপাতাল, ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স) স্বাস্থ্যসেবা, সিমুলেশনভিত্তিক চিকিৎসা শিক্ষা, টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল প্যাথলজি এবং দক্ষতা-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ আন্তর্জাতিক অগ্রযাত্রার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। তাই এমন একটি বিরল মঞ্চে এসব বিষয় নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ রূপান্তরের জন্য একটি সুস্পষ্ট জাতীয় ভিশন ও কর্মপরিকল্পনা তৈরির ভিত্তি হতে পারত।

 

প্রশ্ন উঠতেই পারে-এমন কেন হলো? এর উত্তর নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় নিয়ে ভাবার সময় এসেছে সেটি হল, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এমন আলোচনার আগে কি যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া হয়? ভবিষ্যৎমুখী চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে কাজ করছেন এমন শিক্ষাবিদ, গবেষক, উদ্ভাবক এবং ভিশনারি চিকিৎসকদের মতামত কি পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়? যদি না পায়, তাহলে আমাদের সেই ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

 

বিশ্বের উন্নত যত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠেছে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সম্মিলিত চিন্তা ও পরিকল্পনার মাধ্যমেই এগুলো প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অপরিহার্য, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও দূরদৃষ্টি।

 

বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতে অসংখ্য মেধাবী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিকিৎসক, গবেষক এবং শিক্ষা সংস্কারক রয়েছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে নীতিনির্ধারণে সম্পৃক্ত করা কিংবা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তাঁদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া গেলে দেশের স্বাস্থ্যখাত আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। সবকিছু যদি শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্ধারিত হয়, তবে মেধা, দক্ষতা ও দূরদৃষ্টির যথাযথ মূল্যায়ন হবে না। এর ফলে আমাদের অগ্রযাত্রা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

 

জাতীয় পর্যায়ে এ ধরনের সফর বা উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আগে একটি সংক্ষিপ্ত দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে ‘ভিশন পেপার’ (ভবিষ্যতের রূপরেখা) প্রস্তুত করা যেতে পারে, যেখানে আগামী ১৫- ২০ বছরের অগ্রাধিকার নির্ধারণ থাকবে। দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল, ঢাকা মেডিকেল কলেজের এই ঐতিহাসিক সফরটি শুধু সৌজন্য সাক্ষাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা এবং ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তর নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হবে এবং সে বিষয়ে নীতিগত আলোচনা হবে।

 

সরকারি হাসপাতালে ধাপে ধাপে ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড (ইএমআর) চালু করা। এআই-সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষার জাতীয় নীতি প্রণয়ন। সব মেডিকেল কলেজে সিমুলেশন এন্ড ক্লিনিক্যাল স্কিলস সেন্টার প্রতিষ্ঠা। চিকিৎসা গবেষণার জন্য জাতীয় গবেষণা তহবিল গঠন। বিভাগীয় পর্যায়ে সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রতিষ্ঠা; বিশেষ করে ক্যান্সার, হৃদরোগ, ট্রমা ও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো ক্ষেত্রে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

 

চিকিৎসক ও শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া। চিকিৎসকদের বিদেশে সেমিনার, সম্মেলন, প্রশিক্ষণ ও ফেলোশিপে অংশগ্রহণের জন্য অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা। নতুন মেডিকেল কলেজ অনুমোদনে কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ এবং বিদ্যমান কিছু বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর মানোন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। স্বাস্থ্যসেবায় তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা এবং গুণগত মান উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

 

এই সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকেরা একই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। তাই এটি ছিল এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যেখানে চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিয়ে ভবিষ্যতমুখী চিন্তা, মতবিনিময় এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করার একটি মূল্যবান সুযোগ ছিল।

 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ শুধু চিকিৎসক তৈরির প্রতিষ্ঠান নয়; দেশের চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দেওয়ারও অন্যতম কেন্দ্র। তাই এ ধরনের প্রতিটি সফরকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয় বরং জাতীয় স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। হয়তো এবারের সফরে সেই সম্ভাবনার সবটুকু কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

 

তবে এটিকে একটি মূল্যবান শিক্ষা হিসেবে নিয়ে ভবিষ্যতে যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থা, গবেষণা, চিকিৎসা শিক্ষা ও রোগীকেন্দ্রিক সেবার সুস্পষ্ট রূপরেখা জাতীয় নেতৃত্বের সামনে উপস্থাপন করা যায়, তবে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

 

স্বাস্থ্য খাতে পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় এবার সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ এবং এ খাতের উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় অঙ্গীকার আমাদের আশাবাদী করে। এই অনুকূল পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার এখনই উপযুক্ত সময়। এর জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী, দক্ষ ও কার্যকর চিকিৎসক নেতৃত্ব, যারা জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার ও উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবেন।

 

মেধা, যোগ্যতা ও সততাকে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারলেই বাংলাদেশ একটি আধুনিক, গবেষণানির্ভর ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে। আজকের আলোচনা যদি শুধু বর্তমানের সমস্যা নয়, আগামী দিনের স্বপ্ন, পরিকল্পনা ও রূপান্তরের দিকনির্দেশনা বহন করে, তবেই সেই আলোচনা ইতিহাসে এক অনন্য স্থান লাভ করবে।

 

 

লেখক: প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সার্জারি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট