নুরউদ্দিন-মঈনউদ্দিন। যমজ দুই ভাই। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বের হওয়া পণ্য চুরি করা ওদের কাজ। দেড় বছর আগে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে চোরাই পণ্যসহ হাতেনাতে ধরা পড়ে কারাভোগ করলেও জামিনে বের হয়ে ফের একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে দুইভাই। এবার বন্দর থেকে খালাস করা চীন থেকে আমদানিকৃত ৪০ লাখ টাকার ক্রোকারিজ পণ্য চুরির মূলহাতাও যমজ দুই ভাই। নগর গোয়েন্দা পুলিশ মঈনউদ্দিনকে তার গ্রামের বাড়ি পটিয়ার বাকখাইন থেকে গ্রেপ্তার করেছে। এর আগে গ্রেপ্তার হয়েছে নুর উদ্দিনের কাভার্ডভ্যান চালক নীরব চৌধুরী সাকিব, সহযোগী সাখাওয়াত হোসেন ও আশিক রায়হান নামে আরো তিনজন। তবে নুরউদ্দিন পুলিশের হাত ফসকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। নগরীর কদমতলী ডিটি রোডে তাদের ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের অফিসও রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, অভাবের তাড়নায় ছয় বছর আগে পটিয়ার বাকখাইনের গ্রামের বাড়ি ছেড়ে নগরীতে আসে দুই ভাই। শুরুর দিকে গাড়ির হেলপারের চাকরি করতো। তবে খুব বেশি দিন নয়। পরিচয় হয় পণ্য চুরি সিন্ডিকেট চক্রের সদস্য মনার সঙ্গে। জড়িয়ে পড়ে বন্দর থেকে বের হওয়া পণ্য চুরির সিন্ডিকেটে। ছয় বছরের মাথায় দুই ভাই পণ্য চুরির সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এরমধ্যে তারা কিনেছেন বেশ কয়েকটি কাভার্ডভ্যান। ক্রোকারিজ পণ্য চুরিতে ব্যবহৃত যে কাভার্ডভ্যানটি গোয়েন্দা পুলিশ জব্দ করেছে সেটিও নুরউদ্দিনের। যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করেন অর্ধ লক্ষ টাকা দামের এসইউভি (স্পোর্টস ইউটিলিটি ভ্যাহিকেল) এইচআর কার। গাড়িটি নিয়েছেন কয়েক সপ্তাহ আগে। এরআগে নিশান এক্সট্রেইল জিপ ব্যবহার করতো। রয়েছে পাঁচ লাখ টাকা দামের ইয়ামাহা (আর ওয়ান-৫) মোটরসাইকেল। গ্রামে তৈরি করেছে সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত কোটি টাকার ভবন। গাড়িগুলো পুলিশ জব্দ করেছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম জানান, বন্দর থেকে পণ্য চুরি করা নুরউদ্দিন-মঈনউদ্দিনের পেশা। তারা বিষয়টিকে ব্যবসা হিসাবে দেখেন। ক্রোকারিজ পণ্য চুরির ঘটনার মূলহোতাও দুই ভাই। তাদের মালিকানাধীন বেশ কয়েকটি কাভার্ডভ্যান রয়েছে। বন্দর ভিত্তিক তাদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। চোরাই পণ্য খালাস করার জন্য নগরীতে তাদের নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। কাভার্ডভ্যানের দরজার সিল নিখুঁতভাবে খোলা-বাধা করার জন্য তাদের নির্দিষ্ট লোক রয়েছে। একটি কাভার্ডভ্যানের দরজার সিল খোলা বাধা করতে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়। যে কাভার্ডভ্যান থেকে ক্রোকারিজ পণ্য চুরি হয়েছে সেটির মালিক নুরউদ্দিন।
মঈনউদ্দিনকে পটিয়ার বাকখাইনের গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় নুরউদ্দিন পালিয়ে যায়। গ্রামের বাড়ির চারপাশে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা লাগানো। একতলা বাড়িটির ভেতরে লাগানো হয়েছে চোখ ধাঁধানো আসবাবপত্র। দুই ভাইয়ের ব্যবহৃত একটি অর্ধলক্ষ টাকা দামের কার, পাঁচ লাখ টাকা দামের একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে। নুরউদ্দিন পলাতক রয়েছে।
এজাহারে যা বলা হয়েছে: গত ১১ মে ৪০ লাখ টাকার ক্রোকারিজ পণ্য চুরির অভিযোগ এনে বন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ব্যবসায়ী জামাল হোসেন। এজাহারে তিনি বলেন, তিনি একজন আমদানিকারক। মেসার্স সিয়াম ট্রেডার্স নামে ঢাকায় তাদের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিনি চীন থেকে ১২০০ কার্টন ক্রোকারিজ পণ্য আমদানি করেন। পণ্যগুলো বন্দর থেকে খালাস করার পর গত ৫ মে সকাল সাড় দশটায় তিনটি কাভার্ডভ্যানে পণ্যগুলো ঢাকায় পাঠায়। রাত ১১টা থেকে দেড়টার মধ্যে পণ্যবর্তী কাভার্ডভ্যান ঢাকায় পৌঁছায়। ৬ মে সকাল সাড়ে দশটার সময় পণ্যগুলো নামাতে গিয়ে দেখা যায় ঢাকামেট্রো-ট-১৩-০৩৯৫ নম্বর কাভার্ডভ্যানে ৯৪ কার্টন ক্রোকারিজ পণ্য কম পাওয়া যায়। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৪০ লাখ টাকা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের উপ পরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম জানান, মামলা দায়েরের পর টানা অভিযানে মঈনউদ্দিন ও কাভার্ডভ্যান চালকসহ দুই সহযোগী গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৫০ কার্টন ক্রোকারিজ। এসব পণ্যগুলো টেরিবাজার এলাকায় গুদামে রাখা হয়েছিল।
আগেও গ্রেপ্তার হয়েছিল: ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি বেলা সাড়ে তিনটার সময় নগরীর পাহাড়তলী পোর্ট কানেকটিং রোডের সরাইপাড়া বাস স্টপেজ এলাকা থেকে নুরউদ্দিন ও মঈনউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের কাছে ছয়টি কাপড়ের রোল পাওয়া যায়। যেগুলোর কোন কাগজপত্র তাদের কাছে ছিল না। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি পাহাড়তলী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. হারুন অর রশিদ।
২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দুই যমজভাইসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রবিউল ইসলাম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নুরউদ্দিন ও মঈনউদ্দিন দুই ভাই। আরিফুর রহমান নামে এক ব্যক্তি পাহাড়তলীতে বসবাস করেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে চোরাই চক্রের সঙ্গে জড়িত। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত কাপড় ও সুতার রোল ঢাকাগামী কাভার্ডভ্যান খুলে চুরি করে তারা। ট্রান্সপোর্ট ব্যবসার আড়ালে বন্দর থেকে বের বের হওয়া পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যান থেকে পণ্য চুরি করে। এটাই তাদের একমাত্র পেশা। ঘটনাস্থল থেকে নুরউদ্দিন ও মঈনউদ্দিনকে ছয় রোল চোরাই কাপড়সহ গ্রেপ্তার করা হলেও সহযোগী আরিফুর রহমান পলাতক রয়েছে।
পূর্বকোণ/আরআর
















