চট্টগ্রামে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। সেপ্টেম্বর মাসের প্রতিদিনই নতুন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। একইসঙ্গে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যাও। এ বছরের গত ৮ মাসের মধ্যেই ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সেপ্টেম্বরে। আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়েছে বহুগুণ। গতমাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত-মৃত্যু দুটো বাড়লেও এই মাসে (অক্টোবর) এসেও কোনো স্বস্তির খবর দিতে পারেনি বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসকরা। তাদের শঙ্কা- সেপ্টেম্বর মাসের চেয়েও অক্টোবর মাসে আরও খারাপ হতে পারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। এ জন্য ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে এডিশ মশা নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তবে আশার কথা হল- নভেম্বর মাস থেকে ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী- এ বছর প্রথম ৮ মাসে ৬ জনের মৃত্যু হলেও শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন। একই সময়ে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৩০ জন। তবে চট্টগ্রামে গত ৯ মাসে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৪ হাজার ৪৬৬ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ১৯৩, নারী ১ হাজার ২৭৮ এবং শিশু ৯৯৫ জন। মারা যাওয়া ২১ জনের মধ্যে নারী ১১ জন এবং শিশু ৬ জন। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় ৫২ শতাংশ নারী ও ২৮ শতাংশ শিশু।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় চট্টগ্রাম নগরীর হাসপাতালগুলো বাড়ছে রোগীর চাপ। আক্রান্তদের বেশিরভাগই নগরীর বাসিন্দা। শুধু নগরীর নয়, সীতাকুণ্ড, কর্ণফুলী ও বাঁশখালী উপজেলা থেকেও অনেক ডেঙ্গু রোগী আসছেন হাসপাতালগুলোতে।
আরও জানা যায়, চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী মিলেছে সীতাকুণ্ডে ৫৬২ জন। এছাড়া কর্ণফুলীতে ২৬৭, রাঙ্গুনিয়ায় ১৪৫, বাঁশখালীতে ১৪২, সাতকানিয়ায় ১০৯, আনোয়ারায় ১০৭, রাউজানে ৯৩, পটিয়ায় ৮৮, হাটহাজারীতে ৭৬, মিরসরাইয়ে ৭৪, বোয়ালখালীতে ৭১, চন্দনাইশে ৬৫, লোহাগাড়ায় ৬১, ফটিকছড়িতে ৩৭ এবং সন্দ্বীপে ২৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
এদিকে, ডেঙ্গু সংক্রমণের ওপর ভিত্তি করে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন প্রাথমিকভাবে সীতাকুণ্ডের ৪ এলাকাকে ডেঙ্গুর জন্য ‘বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ’ বা রেড জোন হিসেবে ঘোষণা করেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে একজনের। জুন-জুলাইয়ে মারা গেছে দুইজন করে চারজন। তবে আগস্টে মৃত্যু হয়েছে একজনের। আর সেপ্টেম্বর মাসে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ইউনিট প্রধান ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, সেপ্টেম্বর মাসের চেয়েও অক্টোবর মাসে আরও খারাপ হতে পারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। শিগগিরই যদি মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয় তাহলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গুর মশা দিনে বেশি কামড়ায়। একটি মশা একসঙ্গে ২-৩ জনকেও কামড়াতে পারে। এ বছর শীতের সময় ডেঙ্গু মশা ডিম পাড়লে সেগুলো থেকে পরবর্তী প্রজন্মের মশা জন্ম নিতে পারে আগামী বছর। তাই শীতের পরপরই আমাদের আশপাশের ময়লা-আবর্জনা, নালা-নর্দমা ও জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে। এতে ডেঙ্গু মশার প্রজনন কমানো সম্ভব হবে এবং আগামী বছরের সংক্রমণও নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, জ্বর হলে দেরি না করে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগের শুরুতেই হাসপাতালে গেলে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়। ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলের আশপাশে কোথাও যাতে পানি জমে না থাকে, সেদিকে সবাইকে নজর দিতে হবে। জ্বর বা ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে চট্টগ্রামে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং মারা গেছেন ২৭ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা গেছেন ৪৫ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন ১৪ হাজার ৮৭ জন এবং মারা গেছেন ১০৭ জন।
পূর্বকোণ/এএইচ

















