চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রায় ৪ বছর পর মিজোরাম থেকে ফিরলেন তিন বম পরিবার

প্রায় ৪ বছর পর মিজোরাম থেকে ফিরলেন তিন বম পরিবার

অনুপম মারমা, থানচি সংবাদদাতা

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৮:০৫ পূর্বাহ্ণ

‘নিজ দেশ ও মাতৃভূমি ছেড়ে সুখে নেই। নিজের পাড়া, নিজের মানুষ আর জন্মভূমির টান সবসময় মনে ছিল।’-চার বছর পর নিজ পাড়ায় ফিরে এভাবেই নিজের অনুভূতির কথাগুলো বলছিলেন ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নেওয়া বম সম্প্রদায়ের এক পরিবারের প্রধান। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তা আর কষ্টের দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবশেষে আপন ঠিকানায় ফিরেছেন তারা।

 

বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদে দীর্ঘ বিচ্ছেদের অবসান ঘটিয়ে নিজ গ্রামে ফিরে এসেছে মিজোরাম থেকে আসা বম সম্প্রদায়ের তিনটি পরিবার। ১৮ সদস্যের এই বহরে রয়েছে নারী, পুরুষ ও কোমলমতি শিশুরা।

 

রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাকলাই পাড়া আর্মি ক্যাম্পের সহায়তায় তাদের নিজ নিজ পাড়ায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। বাকলাই পাড়া আর্মি ক্যাম্প কমান্ডার ক্যাপ্টেন সাফকাত মুবাররাত চৌধুরীর নেতৃত্বে সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিন পরিবারের সদস্যদের শেরকর ও প্রাতা পাড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় শেরকর পাড়ার কারবারি তুমথন বম ও প্রাতা পাড়ার কারবারি পার্কেল বম উপস্থিত থেকে তাদের বরণ করে নেন।

 

ফিরে আসা তিন পরিবারের প্রধান ভানরৌখম বম (২৭), রুয়াতখুপ বম (৪৬) ও লালচম বম (৫৫) জানান, ২০২০ সালের দিকে কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির (কেএনএ) তাণ্ডব ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির মুখে নিরাপত্তার খাতিরে তারা ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। মিজোরামে দীর্ঘ দিন কেটেছে চরম উৎকণ্ঠা আর প্রবাসযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে।

 

ফিরে আসার সেই পেছনের গল্পটাও সহজ ছিল না। বম পরিবারের প্রধানরা জানান, ২০২৩ সালে কেএনএ কর্তৃক সেনা ক্যাম্পে গুলি বর্ষণ এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর চিরুনি অভিযানের মুখে পড়ে রুমা ও থানচি উপজেলার সীমান্ত দিয়ে তারা মিজোরামে পাড়ি জমিয়েছিলেন। দীর্ঘ চার বছর পর ২০২৬ সালে বম সোশ্যাল কাউন্সিলের নেতৃবৃন্দ এবং সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশ্বাসে তারা ফের দেশের টানে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেন।

 

গত ১১ সেপ্টেম্বর মিজোরামের শিলকর থেকে রাঙামাটির শিলকোপাড়া সীমান্ত দিয়ে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ১২ বিজিবির থেগামুখ বিওপি প্রথমে তাদের হেফাজতে নেয়। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১১টায় বান্দরবান রিজিয়নের আইসি বিভাগ (১৬ ইবি) তাদের আনুষ্ঠানিক গ্রহণ করে। সেনাবাহিনীর সুচারু তত্ত্বাবধানে তাদের নিরাপদে বাকলাই পাড়া আর্মি ক্যাম্পে পাঠানো হয়।

 

দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে আপন মাটিতে পা রেখে ফিরে আসা মানুষগুলোর চোখেমুখে এখন স্বস্তি আর আবেগের অশ্রু।

ভানরৌখম বম বলেন, ‘নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে থাকলে কখনো নিজের বাড়ির মতো লাগে না। এতদিন পর নিজের পাড়ায় ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। নিজের মাটি ও মানুষের কাছে ফিরে এসেছি, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।’

 

রুয়াতখুপ বম বললেন, ‘বাড়িঘর, আত্মীয়স্বজন ও নিজের পাড়ার কথা সবসময় মনে পড়ত। মিজোরামে শরীরটা থাকলেও মন পড়ে থাকত এই পাহাড়ে।’

 

লালচম বম যোগ করলেন, ‘মাতৃভূমি ছেড়ে কেউ সুখে থাকে না। নানা কষ্টের মধ্যে এত বছর পার করেছি। এখন নিজের পাড়ায় ফিরে এসেছি, পরিবার নিয়ে আর কিছু নয়, শুধু শান্তিতে বাঁচতে চাই।’

 

ঘরে ফেরার এই আনন্দযাত্রায় পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। নিজ পাড়ায় পৌঁছানোর আগে বাকলাই পাড়া আর্মি ক্যাম্পের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য নগদ ১৫ হাজার টাকা, ৫০ কেজি চাল, ১০ কেজি ডাল, ৫ কেজি করে তেল, পেঁয়াজ, আলু, লবণ এবং একটি করে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র তুলে দেওয়া হয়।

 

একদিকে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের ক্ষত, অন্যদিকে আপনজনদের মাঝে ফেরার বুকভরা স্বস্তি- সব মিলিয়ে এক মিশ্র অনুভূতির মধ্য দিয়ে নতুন জীবনের খাতা খুললেন এই তিন বম পরিবারের সদস্যরা। অতীতের সব শঙ্কা ও অনিশ্চয়তাকে পেছনে ফেলে তারা এখন স্বপ্ন দেখছেন পাহাড়ের বুকে নতুন করে শান্তিতে বেঁচে থাকার।

 

পূর্বকোণ/রানা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট