চট্টগ্রাম সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কেন্দ্র  হয়ে উঠছে আনোয়ারা

বন্দর-টানেল-মাতারবাড়ি ঘিরে উন্নয়ন

সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠছে আনোয়ারা

সুমন শাহ

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ২:১৪ অপরাহ্ণ

কর্ণফুলী নদীর ওপারে একসময় ছিল মূলত কৃষিনির্ভর জনপদ। চট্টগ্রাম নগর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের আনোয়ারা তখনও নগরায়ণের মূল স্রোত থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। কিন্তু সেই চিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। কর্ণফুলী টানেল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, নতুন শিল্পকারখানা, আঞ্চলিক মহাসড়ক, বন্দরকেন্দ্রিক যোগাযোগ এবং মাতারবাড়িকে ঘিরে বড় অবকাঠামোগত পরিকল্পনা- সব মিলিয়ে আনোয়ারা এখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর আনোয়ারায় ৭৮৩ একর জমিতে গড়ে উঠতে থাকা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে। প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘিরে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বড় কর্মযজ্ঞ। ২০৩০ সালের মধ্যে শিল্পাঞ্চলের একটি বড় অংশে উৎপাদনমুখী কারখানা চালুর লক্ষ্য রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে আনোয়ারার অর্থনীতি কৃষিনির্ভরতা থেকে শিল্প ও সেবা ভিত্তিক অর্থনীতির দিকে আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।
শিল্পায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনোয়ারা: আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে শুধু জমিতে কারখানা স্থাপনের মধ্যেই এর প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তৈরি হবে গুদাম,পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা, আবাসন, বাজার,  শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নতুন চাহিদা। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে পরিবহন, খাবারের দোকান, নির্মাণসামগ্রী, মেরামত, আবাসন, নিরাপত্তা, সরবরাহ ও বিভিন্ন সেবাখাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। 
টানেল থেকে শিল্পাঞ্চল যোগাযোগের নতুন অর্থনীতি আনোয়ারার সম্ভাবনার সঙ্গে কর্ণফুলী টানেলের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। টানেল চালুর পর প্রত্যাশিত যানবাহন না পাওয়া এবং উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের কারণে এর আর্থিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু শিল্পায়ন ও বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাডলে টানেলের ব্যবহারও বাড়তে পারে।
বন্দর-টানেল-মাতারবাড়ি: আনোয়ারার সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভৌগোলিক অবস্থান। একদিকে চট্টগ্রাম বন্দর, অন্যদিকে কর্ণফুলী টানেল। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কক্সবাজারমুখী সড়ক, বাঁশখালী-পেকুয়া হয়ে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ভবিষ্যতের বে টার্মিনাল। এই সংযোগগুলো বাস্তবায়িত হলে আনোয়ারা শুধু একটি শিল্পাঞ্চল থাকবে না; এটি পরিণত হতে পারে পণ্য পরিবহন ও লজিস্টিকসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্টে।
চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনাতেও এই সম্ভাবনার প্রতিফলন রয়েছে। সেখানে ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানোর উপযোগী বহুমুখী জেটি ও সংযোগ সড়ক এবং প্রতিদিন ২ কোটি ৫০ লাখ লিটার ক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের মতো অবকাঠামো রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। 
কমছে দূরত্ব, বাড়ছে সম্ভাবনা
আনোয়ারাকে ঘিরে নতুন সড়ক যোগাযোগও এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। আনোয়ারা-দোহাজারী-কক্সবাজার বাইপাস সংযোগ সড়ক এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-টইটং-পেকুয়া-বদরখালী-চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের মতো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজার ও মাতারবাড়ির যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
নতুন আঞ্চলিক মহাসড়কটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এবং ঢাকা-কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আনোয়ারার শিল্পাঞ্চল থেকে উৎপাদিত পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর, কক্সবাজার কিংবা মাতারবাড়ির দিকে দ্রুত পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে।
কৃষির জনপদ থেকে উপশহর: শিল্পায়নের প্রভাব শুধু কারখানার গন্ডিতে থাকবে না। মানুষের বসতি, জমির ব্যবহার এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যানে আনোয়ারাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলাকে যুক্ত করে পরিকল্পিত মিনি শহর ও স্যাটেলাইট টাউন গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। বাস্তবায়ন হলে শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে আবাসিক এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার ও নাগরিক সেবার বিস্তার ঘটতে পারে।
শুধু কারখানা নয়, দরকার দক্ষ মানুষ
আনোয়ারার সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে দক্ষ জনবল তৈরি। শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ এলেও স্থানীয় মানুষ যদি প্রয়োজনীয় দক্ষতা না পান, তাহলে বড় অংশের কর্মসংস্থান বাইরের শ্রমবাজারের ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে স্থানীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংযোগ তৈরি করা জরুরি। নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরানের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগে অবকাঠামো তৈরি করে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা হয়েছে। তাই এখনই টানেল বা আনোয়ারার ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে মাতারবাড়ি ও বে-টার্মিনালের ভবিষ্যৎ ট্রাফিক সামলাতে যোগাযোগ অবকাঠামোর সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।
পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট