চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঠিকাদারের গাফিলতির খেসারত!

সন্দ্বীপে ৫৬২ কোটি টাকার বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প

ঠিকাদারের গাফিলতির খেসারত!

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১২:৪০ অপরাহ্ণ

দ্বীপকন্যা সন্দ্বীপ সুরক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে ৫৬২ কোটি টাকার প্রকল্প নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। ঠিকাদারের গাফিলতিতে ৩ বছর ধরে হাবুডুবু খাচ্ছে প্রকল্পটি নিয়ে। বার বার তাগাদা, কার্যাদেশ বাতিল ও কালো তালিকাভুক্তির ভয় দেখিয়েও ঠিকাদারদের বাগে আনা যায়নি। কাজ হয়েছে মাত্র ৮-৯ শতাংশ। অথচ প্রকল্পটি আগামী বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন প্রকল্পটি কাটছাঁট করে নতুন করে শুরু করার পরিকল্পনা নিচ্ছে পাউবো।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর-২ বিভাগ) ড. তানজির সাইফ আহমেদ গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘প্রকল্পটি কাটছাঁট করে ব্যয় ৫৬২ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৪০০ কোটির মধ্যে আনা হবে। আর তিন ঠিকাদারের কিছু কাজ বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া করা হচ্ছে।’

 

২০২৩ সালের ১৮ জুলাই সন্দ্বীপে ভাঙন প্রতিরোধে ৫৬২ কোটি ২১ লাখ টাকার প্রকল্প নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০২৪ সালের ১৭ ভাগে ভাগ করে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। কিন্তু কাজ পাওয়া বেশির ভাগ ঠিকাদারই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা। ক্ষমতার পালা বদলের পর ঠিকাদারদের কেউ হন গ্রেপ্তার, কেউ চলে যান আত্মগোপনে। বড় ঠিকাদাররা উধাও হয়ে যাওয়ায় কাজের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। সন্দ্বীপবাসীর দুঃখ দীর্ঘায়িত হয়। ৫৬২ কোটি টাকার বেশির ভাগ পায় চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে তিনটিই হচ্ছে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতার প্রতিষ্ঠান।

 

পাউবো সূত্র জানায়, প্রকল্পের ১৭ ভাগের মধ্যে আট ভাগ কাজ পায় মেসার্স বিশ্বাস বিল্ডার্স। ৫৬২ কোটি টাকার প্রকল্পে ২৫০ কোটি টাকার কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক নজরুল ইসলাম (দুলাল) ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। পাউবোর সঙ্গে করা চুক্তি মতে ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ শুরু করার কথা ছিল প্রতিষ্ঠানটির। ৮ প্যাকেজের মধ্যে দু-একটির কাজ শুরু করেছে। আড়াই বছরে সবমিলে কাজ করেছে মাত্র ২-৩ শতাংশ।

 

অভিযোগ রয়েছে, সন্দ্বীপ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতার ঘনিষ্টজন হিসেবে বেশি কাজ পায় বিশ্বাস বিল্ডার্স। এর আগেও সন্দ্বীপে ২০৫ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্পে বিশ্বাস বিল্ডার্সের কাজ নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল।

 

একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে আত্মগোপনে চলে যান বিশ্বাস বিল্ডার্সের মালিক নজরুল ইসলাম (দুলাল)। এমএম বিল্ডার্স নামে এক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে দুই প্যাকেজের কাজ পায় রয়েল এসোসিয়েট। প্রতিষ্ঠানটিও কাজ করেছে মাত্র ২-৩ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির মালিক পটিয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও নিষিদ্ধ নগর যুবলীগ নেতা দিদারুল আলম। প্রায় ৫৬ কোটি টাকার কাজ পায় এই দুই প্রতিষ্ঠান। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন। পরে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগের পর বর্তমানে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

 

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মোহাম্মদ এমরান বলেন, ‘প্রকল্প এলাকার খালগুলোতে চর জেগে ভরাট হয়ে যায়। যারফলে নির্মাণসামগ্রী পৌঁছানো দুষ্কর হয়ে পড়ে। তারপরও কিছু কাজ করেছি। এখন মধ্যপাচ্যে যুদ্ধের কারণে পাথর সংকট সৃষ্টি হয়েছে। দামও অনেক বেড়ে গেছে। পাথর সংকটে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

 

৭ প্যাকেজের কাজ পায় মেসার্স ই-ইঞ্জিনিয়ারিং ও খুলনা শিপ ইয়ার্ড। ই-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পের চারটি প্যাকেজে ১১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার কাজ পায়। এরমধ্যে দুই প্যাকেজে কিছু কাজ করেছে। খুলনা শিপইয়ার্ড তিনটি প্যাকেজে ৮৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকার কাজ। এছাড়া মাটি ভরাটের কাজ পায় মেসার্স হাসান এন্ড ব্রাদার্স এবং জামান ব্রাদার্স নামে দুটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এই দুই প্রতিষ্ঠান মাটির বাঁধ নির্মাণের কাজ করেছে বলে জানায় পাউবো।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর-২ বিভাগ) ড. তানজির সাইফ আহমেদ গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘কোনো কোনো ঠিকাদার কিছু কিছু ব্লক নির্মাণ করেছে। সবমিলিয়ে প্রকল্পের কাজ হয়েছে ৮-৯ শতাংশ।’

 

ছোট হচ্ছে ব্লক : ৫৬২ কোটি টাকার প্রকল্প এখন কমিয়ে ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে প্রকল্পের অন্যান্য কাজ ঠিক রেখে এখন ব্লকের সাইজ ছোট করা হবে বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী তানজির সাইফ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বর্তমান ডিজাইনে ব্লকের আকার বড় রয়েছে। ব্লকের আকার ছোট করে নতুন করে ডিজাইন করা হচ্ছে। এতে খরচ অনেক কমে যাবে।’

 

প্রকল্পে ২১ লাখ ব্লক বসানোর কথা ছিল। এখনো এক লাখ ব্লক নির্মাণ করা হয়নি। সাগরের ভাঙনরোধে ১২ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার টেকসই বাঁধ নির্মাণ, দুইটি নতুন স্লুইট গেট নির্মাণ করা হবে। এছাড়া সাতটি পুরনো স্লুইস গেট মেরামতে ৫৬২ কোটি টাকার প্রকল্প নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট