চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ফিলিস্তিনের নিরাপত্তা ছাড়া কি সম্ভব ইসরায়েলের নিরাপত্তা?

মন্তব্য প্রতিবেদন

ফিলিস্তিনের নিরাপত্তা ছাড়া কি সম্ভব ইসরায়েলের নিরাপত্তা?

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

ইসরায়েল ও ব্রিটেনের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুধু দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির ঘটনা নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের এক শতাব্দীপ্রাচীন সংকটের মৌলিক প্রশ্ন। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডার সাম্প্রতিক পদক্ষেপের জবাবে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর বক্তব্য, বসতি সম্প্রসারণ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে সংকুচিত করছে এবং দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে বিপন্ন করছে।

 

এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের আড়ালে তাই একটি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকার উপেক্ষা করে ইসরায়েল কি নিজের নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করতে পারবে?

 

ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ইসরায়েলি নাগরিকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা, জিম্মি করা কিংবা রকেট হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ইসরায়েলি সমাজের নিরাপত্তাবোধকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। একটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব তার নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করা।

 

কিন্তু নিরাপত্তার আরেকটি বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। দীর্ঘদিনের দখল, ভূমি হারানো, চলাচলে বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বাধাগ্রস্ত হওয়া ফিলিস্তিনি সমাজে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে। যে জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন নিরাপত্তাহীন ও ভবিষ্যৎহীন অবস্থায় থাকে, সেই পরিবেশ কি শেষ পর্যন্ত তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জন্যও নিরাপদ থাকে?

 

পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের ফলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ক্রমশ খণ্ডিত হচ্ছে। এতে একটি সংযুক্ত ও কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক সমাধানের পথ যত সংকুচিত হচ্ছে, সংঘাতের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিও তত বাড়ছে।

 

এখানে একটি পার্থক্য জরুরি। ফিলিস্তিনিদের ক্ষোভের রাজনৈতিক কারণ বোঝা মানে সন্ত্রাসকে বৈধতা দেওয়া নয়। বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা, জিম্মি করা কিংবা নির্বিচার সহিংসতা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু সন্ত্রাস মোকাবিলায় শুধু সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয়; তার পেছনের রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও মোকাবিলা করতে হয়।

 

৭ অক্টোবরের ঘটনা ইসরায়েলের জন্য সেই কঠিন শিক্ষাই বহন করে। বিপুল সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এমন হামলা ঠেকানো সম্ভব হয়নি। এর অর্থ সামরিক শক্তি অপ্রয়োজনীয় নয়; বরং সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক নিরাপত্তাও অপরিহার্য।

 

ইসরায়েলের ভেতরেও এমন মত জোরালো হচ্ছে যে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করার নীতি শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের নিরাপত্তাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এতে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতাও বাড়তে পারে।

 

সুতরাং ফিলিস্তিন প্রশ্ন শুধু মানবিক সংকট নয়; এটি ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও।

 

ব্রিটেনের ঐতিহাসিক ভূমিকা

 

এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটেনের অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণায় ব্রিটেন ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি ‘জাতীয় আবাসভূমি’র প্রতি সমর্থন জানায়। পরবর্তী ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের সময় ইহুদি ও আরবদের সংঘাত তীব্র হয়। ১৯৪৮ সালে ম্যান্ডেটের অবসান ও ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পরও ফিলিস্তিন প্রশ্নের সমাধান হয়নি।

 

আজ সেই ব্রিটেনই ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছে এবং দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে— ইতিহাসের এক গভীর পরিহাস।

 

তবে বর্তমানের দায়িত্ব অতীতের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত কোনো পক্ষকে দুর্বল করা নয়, বরং এমন রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করা যেখানে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়েই নিরাপদে সহাবস্থান করতে পারে।

 

দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান তাই কোনো পুরোনো কূটনৈতিক স্লোগান নয়। এটি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তারও একটি বাস্তব কৌশল।

 

ইসরায়েলের নিরাপত্তা শুধু প্রাচীর, অস্ত্র, গোয়েন্দা সক্ষমতা কিংবা সামরিক অভিযানের ওপর নির্ভর করতে পারে না। নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক পরিবেশেরও ফল। সামরিক শক্তি একটি রাষ্ট্রকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধানই।

 

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বড় ভুলগুলোর একটি হলো দুই পক্ষের নিরাপত্তাকে শূন্য-সম খেলায় দেখা। বাস্তবতা হলো, ফিলিস্তিনি নিরাপত্তাহীনতা ইসরায়েলের নিরাপত্তাকেও দুর্বল করে।

 

ইসরায়েলকে কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়- এই প্রশ্ন না করে বরং ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন দুই জনগোষ্ঠীকে কীভাবে একই সঙ্গে নিরাপদ করা যায়, সেই প্রশ্নই এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক। স্থায়ী শান্তির জন্য ইসরায়েলকে শুধু শক্তিশালী নয়, ফিলিস্তিনকেও নিরাপদ হতে দিতে হবে।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট