চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বেকিং সোডা ও ভিনেগারের গল্প

বেকিং সোডা ও ভিনেগারের গল্প

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১২:৩১ অপরাহ্ণ

আমাদের ছেলেবেলায় স্কুল ছুটির পর বাসায় ফেরার পথে প্রায়ই রাস্তার মোড়ে, হাটের পাশে কিংবা বাজারের কোনো খোলা জায়গায় ক্যানভাসারদের জটলা দেখা যেত। কেউ কড মাছের কাঁটা দিয়ে বানানো কথিত ব্যথার ওষুধ বিক্রি করত, কেউ ‘রাজমোহিনী তাবিজ’ হাতে নিয়ে প্রেম, ভাগ্য আর অমঙ্গল কাটানোর নিশ্চয়তা দিত। কেউ আবার ছোট ছোট সাপ নিয়ে বসত, বেহুলা-লখিন্দরের গল্প শোনাত, তারপর উপস্থিত দর্শকদের আবেগে ভাসিয়ে ‘সাপকে দুধ খাওয়ানোর’ নামে টাকা তুলত। তাদের মূল শক্তি ছিল পণ্য নয়—কথা। কেউ জোরে কথা বলত, কেউ রহস্য তৈরি করত, কেউ ভয় দেখাত, কেউ অলৌকিক সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিত। কথা এমনভাবে সাজানো হতো যে সাধারণ মানুষ কিছুক্ষণের জন্য হলেও বিশ্বাস করে ফেলত। সেই ক্যানভাসারদের অনেকেই হয়তো এখন রাস্তার মোড়ে নেই। কিন্তু ক্যানভাসিং বন্ধ হয়নি; বরং প্রযুক্তির হাত ধরে তা আরও শক্তিশালী হয়েছে।

 

আজ সেই জটলার জায়গা নিয়েছে ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। আগের ক্যানভাসারের সামনে হয়তো পঞ্চাশজন মানুষ দাঁড়াত; এখন একজন সোশ্যাল মিডিয়া ক্যানভাসারের সামনে কয়েক লাখ দর্শক। আগের জন তাবিজ বা ব্যথার তেল বিক্রি করত, আর আজকের কেউ কেউ বিক্রি করছেন ‘বডি ডিটক্স’, ‘গাট ক্লিনজিং’, ‘লিভার ক্লিনজিং’, ‘আলকালাইন বডি’ কিংবা ‘টক্সিন বের করে দেওয়ার’ নানা কাল্পনিক তত্ত্ব। পদ্ধতি কিন্তু খুব একটা বদলায়নি। এখনও মূল অস্ত্র আত্মবিশ্বাসী কথা, ভয় সৃষ্টি, রহস্যময় ব্যাখ্যা এবং সহজ সমাধানের প্রতিশ্রুতি।

 

ইদানীং বাংলাদেশে ‘বডি ডিটক্স’, ‘গাট ক্লিনজিং’, ‘লিভার ক্লিনজিং’ কিংবা ‘শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেওয়া’—এ ধরনের শব্দের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু স্বঘোষিত ‘লাইফস্টাইল কোচ’, ‘হেলথ এক্সপার্ট’ ও ‘ন্যাচারাল হিলার’ এমনভাবে এসব ধারণা প্রচার করছেন, যেন মানবদেহের ভেতরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ময়লা ও বিষাক্ত পদার্থ জমে থাকে এবং বিশেষ কোনো পানীয়, বেকিং সোডা, অ্যাপল সাইডার ভিনেগার, লেবুর পানি, হারবাল চা কিংবা কয়েক দিনের উপবাসের মাধ্যমে সেই ময়লা ধুয়ে ফেলতে হয়। তাদের বক্তব্য শুনলে কখনো কখনো মনে হয়, মানুষের পাকস্থলী ও অন্ত্র যেন পৌরসভার পুরোনো নালা—যার দেয়ালে বছরের পর বছর ময়লা, চর্বি আর গ্রিজ জমে আছে; সকালে খালি পেটে এক গ্লাস পানিতে বেকিং সোডা ও ভিনেগার মিশিয়ে খেলেই সব ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

মানবদেহ কোনো নর্দমা নয় : সুস্থ মানুষের পাকস্থলী বা অন্ত্রের দেয়ালে এভাবে ‘বিষাক্ত ময়লা’ কিংবা ‘গ্রিজ’ জমে থাকে না, যেটি কোনো বিশেষ পানীয় দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে। মানবদেহের নিজস্ব অত্যন্ত কার্যকর বর্জ্য অপসারণ ও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা রয়েছে। এই কাজের প্রধান অঙ্গ লিভার বা যকৃৎ। খাবার, ওষুধ, অ্যালকোহল এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ শরীরে প্রবেশ করার পর লিভার সেগুলোর অনেককেই বিপাক করে। প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু পদার্থকে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যাতে সেগুলো শরীর থেকে সহজে বের হতে পারে। কিডনি প্রতিনিয়ত রক্ত ফিল্টার করে ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন, অতিরিক্ত পানি ও লবণসহ বিভিন্ন বর্জ্য প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। একই সঙ্গে কিডনি শরীরের পানি, ইলেকট্রোলাইট ও অ্যাসিড-বেস ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। ফুসফুস শ্বাসের মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে এবং পরিপাকতন্ত্র অপাচ্য খাদ্য ও অন্যান্য বর্জ্য মলের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। অর্থাৎ শরীরের স্বাভাবিক ‘ডিটক্স’ কোনো সাত দিনের কোর্স নয়। এটি দিনে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন চলতে থাকা স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।

 

‘টক্সিন’ আসলে কোনটি? কেউ যখন বলেন, ‘এই পানীয় শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেবে’, তখন তার কাছে কয়েকটি খুব সাধারণ প্রশ্ন করা উচিত— কোন টক্সিন? তার নাম কী? কোথায় জমেছে? কী পরীক্ষায় সেটি ধরা পড়েছে? পানীয়টি খাওয়ার আগে ও পরে তার মাত্রা কত ছিল? কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে যে ওই পানীয়টি সেটি শরীর থেকে বের করে দেয়? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবশ্যই বিষাক্ত পদার্থ রয়েছে—যেমন সিসা, মিথানল, কার্বন মনোক্সাইড, কীটনাশক কিংবা নির্দিষ্ট ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রা। কিন্তু প্রতিটি বিষক্রিয়ার আলাদা চিকিৎসা রয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে অ্যান্টিডোট, কোনো ক্ষেত্রে হাসপাতালে পর্যবেক্ষণ, আবার কোনো ক্ষেত্রে ডায়ালাইসিস পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। এক গ্লাস ভিনেগার কিংবা বেকিং সোডা এসব বিষক্রিয়ার চিকিৎসা নয়।

 

‘গাট ক্লিনজিং’—অন্ত্র কি সত্যিই ধুয়ে পরিষ্কার করতে হয়? অন্ত্র কোনো প্লাস্টিকের পাইপ নয়। এটি একটি জীবন্ত অঙ্গ। এর ভেতরে খাদ্য, পানি, হজম হওয়া উপাদান, অসংখ্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া এবং মল থাকা স্বাভাবিক। বৃহদান্ত্রের অন্যতম কাজই হচ্ছে পানি শোষণ করা এবং মল তৈরি করা। তারপর স্বাভাবিক মলত্যাগের মাধ্যমে মল শরীর থেকে বের হয়ে যায়। কেউ যদি কোনো ‘ক্লিনজিং ড্রিংক’ খেয়ে বারবার পাতলা পায়খানা করেন, তার অর্থ এই নয় যে বহু বছরের ‘জমে থাকা টক্সিন’ বের হয়ে যাচ্ছে। বরং এর ফলে শরীর থেকে পানি, সোডিয়াম, পটাশিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রোলাইট হারিয়ে ডিহাইড্রেশন ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। ডায়রিয়া ডিটক্সের প্রমাণ নয়।

 

বেকিং সোডা ও ভিনেগারের গল্প : বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বহুল প্রচারিত পরামর্শ হলো—এক গ্লাস পানিতে বেকিং সোডা ও অ্যাপল সাইডার ভিনেগার মিশিয়ে খেলে অন্ত্র পরিষ্কার হয়, শরীর ‘আলকালাইন’ হয় এবং টক্সিন বেরিয়ে যায়। বেকিং সোডা হলো সোডিয়াম বাইকার্বোনেট, একটি ক্ষারীয় পদার্থ। ভিনেগারের প্রধান সক্রিয় উপাদান অ্যাসিটিক অ্যাসিড। এ দুটি মিশলে স্বাভাবিক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়, তাই মিশ্রণটি ফেনা করে। এই ফেনা কোনো ‘ডিটক্স রিঅ্যাকশন’ নয়। এটি স্কুলের রসায়নের সাধারণ অ্যাসিড-বেস বিক্রিয়া। এর মাধ্যমে অন্ত্রের দেয়াল থেকে কোনো কাল্পনিক ময়লা উঠে আসছে না এবং শরীরের বিষাক্ত পদার্থও ধুয়ে যাচ্ছে না। খাবার খেয়ে শরীরের pH বদলে দেওয়া যায়?

 

‘শরীর বেশি অ্যাসিডিক হয়ে গেছে, তাই আলকালাইন করতে হবে’—এটিও বহুল প্রচারিত একটি ভুল ধারণা। মানুষের রক্তের pH অত্যন্ত সংকীর্ণ সীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রিত থাকে। মূলত ফুসফুস ও কিডনি এই নিয়ন্ত্রণ করে। একজন সুস্থ মানুষের সাধারণ খাবার বা পানীয় খেয়ে রক্তের pH ইচ্ছামতো অ্যাসিডিক বা আলকালাইন করে ফেলা সম্ভব নয়। রক্তের pH যদি সত্যিই উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটি ওয়েলনেস সমস্যা নয়; বরং এটি গুরুতর চিকিৎসাজনিত পরিস্থিতি হতে পারে। তাই সকালে এক গ্লাস ক্ষারীয় পানীয় খেয়ে পুরো শরীরের pH ‘ঠিক করে দেওয়া’ শারীরবৃত্তীয়ভাবে সঠিক ধারণা নয়। (চলবে)

 

লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট