চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত উপজেলা সীতাকুণ্ড। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কারণে সীতাকুণ্ডের মানুষ যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুফল পেলেও, উল্টো পিঠে রয়েছে ভিন্ন চিত্র। উন্নত যোগাযোগের কারণে মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অনেক শিল্পকারখানা। তাতে আবার দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। শিল্পের চাহিদা মেটাতে ভ‚-গর্ভস্থ পানি মাত্রাতিরিক্ত তুলে নেওয়ার কারণে নিচে নেমে গেছে পানি স্তর। এতে গভীর নলক‚পগুলোতে মিলছে না সুপেয় পানি। এরফলে সুপেয় পানির সংকটে থাকেন সীতাকুণ্ডবাসী।
উপজেলার নানা সম্ভাবনা ও সমস্যা সামনে রেখে দৈনিক পূর্বকোণে আয়োজন করেছে ‘স্বনির্ভর সীতাকুণ্ড: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা। সম্প্রতি পূর্বকোণ সেন্টারের ইউসুফ চৌধুরী কনফারেন্স হলে এই গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ আলীর সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব জসিম উদ্দিন মাহমুদ, সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব কাজী মহিউদ্দিন, জামায়াতে ইসলামীর সীতাকুণ্ড উপজেলার সেক্রেটারি মোহাম্মদ আবু তাহের, সীতাকুণ্ড হেলথ এন্ড এডুকেশনের চেয়ারম্যান ও সীতাকুণ্ড সমিতির ভাইস চেয়ারম্যান শিল্পপতি মাস্টার আবুল কাসেম, সীতাকুণ্ড সমিতির সহ-সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ ইকবাল, পরিবেশবিদ মোহাম্মদ আলী শাহীন, সীতাকুণ্ড প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি এম হেদায়েত ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সদস্য নাজিম উদ্দিন।
সরকারের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব জসিম উদ্দিন মাহমুদ বলেন, সীতাকুণ্ডকে সীতাকুণ্ডের জন্য নয়, সারাদেশের জন্য সীতাকুণ্ডের উন্নতি করতে হবে। সম্ভাবনাময় এ উপজেলার সমস্যা অনেক। সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে এ জনপদের মানুষ। সীতাকুণ্ডের ভূমি কৃষি ঊর্বর। এখানকার উৎপাদিত কৃষিপণ্য চট্টগ্রাম শহরেও সরবরাহ করা হয়।
আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কৃষি অবকাঠামো তৈরি, পণ্যের বাজারজাতের সুবিধা প্রদান, আধুনিক হিমাগার তৈরি করা হলে কৃষকেরা উৎপাদন বৃদ্ধিতে আরও উৎসাহী হবে। শিল্পকারখানা সমৃদ্ধ সীতাকুণ্ড দেশের অন্যতম ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র। সীতাকুণ্ডে রয়েছে শত শত শিল্পকারখানা। কিন্তু এসব কারখানায় সীতাকুণ্ডের মানুষ কর্মসংস্থানে তেমন সুবিধা পায় না। বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও সীতাকুণ্ডে গড়ে উঠেনি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র। অথচ এ উপজেলার পাহাড় ও সমুদ্রের সম্মিলনের সৌন্দর্য দেশে খুব কমই আছে।
উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব কাজী মহিউদ্দিন বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট নিরসনে মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ কাজ দ্রুত শেষ করা দরকার। সীতাকুণ্ডে পর্যাপ্ত শিল্প কারখানা রয়েছে। কিন্তু সীতাকুণ্ডের লোকজন চাকরি পাচ্ছে না। অন্ততপক্ষে ৫০% চাকরি দিতে হবে। একইসাথে চাহিদা অনুযায়ী কয়েকটা কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। যাতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট নিরসনে নগরীর সিটি গেট থেকে সীতাকুণ্ড দারোগাহাট পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেক্সওয়ে নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
সীতাকুণ্ডে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে আমাদের জিরো টলারেন্স ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং যেকোনো উপায়ে এটি বন্ধ করতে হবে। শিল্পের তরল বর্জ্য খালে ফেলার কারণে পরিবেশ দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। তাই সীতাকুণ্ডের প্রত্যেক শিল্পকারখানায় ইটিপি স্থাপনে বাধ্য করতে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কঠোর নজরদারি করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সীতাকুণ্ড উপজেলার সেক্রেটারি মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রেও চিকিৎসকসহ লোকবল সংকট রয়েছে। হাসপাতালগুলোর শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করে স্বাস্থ্য সেবা বাড়ানো দরকার। সীতাকুণ্ডে কৃষিপণ্য বেচাকেনায় সিন্ডিকেট রয়েছে। এজন্য কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না। সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। কৃষিতে আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। সীতাকুণ্ডে নিরব চাঁদাবাজি চলছে। এ কাজে কারা জড়িত তা প্রশাসনের জানা রয়েছে। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এতে ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।
সীতাকুণ্ডে পৌরসভায় দুটি দীঘিতে বর্জ্য ফেলার কারণে এগুলো অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এগুলোর প্রাণ ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এখানকার শিল্প-কারখানায় মেধার ভিত্তিতে সীতাকুণ্ডের বেকার যুবকদের নিয়োগ দিলে উপকৃত হবে মানুষ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে যাত্রীছাউনি, ফুটওভার ব্রিজ ও গণশোচাগার অপ্রতুল। এসব সংকট দূর করতে হবে।
সীতাকুণ্ড হেলথ এন্ড এডুকেশনের চেয়ারম্যান ও সীতাকুÐ সমিতির ভাইস চেয়ারম্যান শিল্পপতি মাস্টার আবুল কাসেম বলেন, সীতাকুণ্ডে সুপেয় পানির সংকট অত্যন্ত প্রকট। আগামী ১০-১৫ বছর পর সীতাকুণ্ডবাসী সুপেয় পানি পাবে কিনা আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় সীতাকুণ্ডের সুপেয় পানি সংকট নিরসনে চট্টগ্রাম ওয়াসা পানির পাইপলাইন সীতাকুণ্ড পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুইপাশে অসংখ্য ছোট বড় শিল্প কারখানা রয়েছে। মেরিন ড্রাইভ চট্টগ্রাম শহর থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত, অন্যদিকে ফেনীর দিক থেকে মিরসরাই পর্যন্ত তৈরি হয়েছে; মাঝখানে এখনো তৈরি হয়নি। এ অবস্থায় ২৩ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ সম্পন্ন করলে বন্দরের মালামাল পরিবহন একদিকে যেমন সহজ হতো, অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট কমতো।
সীতাকুণ্ড সমিতির সহ-সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, সীতাকুণ্ডের ইকো ট্যুরিজম ও ধর্মীয় পর্যটন শিল্পের জন্য রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। কিন্তু সরকারিভাবে পর্যটনের জন্য কিছুই করা হয়নি। ধর্মীয় কারণে চন্দ্রনাথ পাহাড় পর্যটনের একটা ক্ষেত্র। এছাড়াও এটা প্রাকৃতিক দৃশ্যের ক্ষেত্রেও অন্যতম পর্যটন স্থান। এখানে হাজার হাজার পর্যটক চন্দ্রনাথ পাহাড়ে আসে। কিন্তু তাদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। গুলিয়াখালী সৈকতের মতো দ্বিতীয়টি আমাদের নেই। এখানে প্রকৃতির যেই সুন্দর ঘাস বিছানো সৈকত, এটা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হলে পর্যটনের সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে।
পরিবেশবিদ মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশ দূষণ বা সমুদ্র দূষণ নিয়ে কথা বলা হয়। তবে শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি গত তিন -চার বছরে গ্রিন শিপ রিসাইক্লিংয়ের দিকে যাচ্ছে। গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং হচ্ছে- একটা আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডের মধ্যে শিপ রিসাইক্লিংকে নিয়ে যাওয়া। পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। এটাকে প্রসার করা গেলে বাংলাদেশে অন্য কোন এক্সট্রা ইন্ডাস্ট্রি লাগবে না। আগামী ১০- ১২ বছরে ১৫ হাজার জাহাজ শিপ রিসাইক্লিংয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বিশ্ববাজার। ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশকে এই বাজার ধরতে হবে।
উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সদস্য নাজিম উদ্দিন বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা দক্ষ সংগঠক ও মাঠের খুবই অভাব। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনের সমন্বয় না হলে এসব সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। মূলত মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে উপজেলার সর্বত্র খেলাধুলা ছড়িয়ে দিতে হবে। উপজেলার ক্রীড়া সংস্থাকে ঢেলে সাজানো ও নতুন একাডেমি তৈরি করা এবং স্কুল-কলেজগুলোতে খেলাধুলার নিয়মিত আয়োজন করা দরকার।
সীতাকুণ্ড প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি এম হেদায়েত বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে ঢাকা থেকে অল্প সময়ের মধ্যে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত আসা সম্ভব হলেও সীতাকুণ্ডের ৩৬ কিলোমিটারের মধ্যে ভোগান্তি হয় অসহনীয়। অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনার কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। সীতাকুণ্ডের বেড়িবাঁধ দিয়ে একটা সড়ক হওয়ার কথা ছিল। এটা করা হলে যানজট অনেকাংশে কমে যাবে।
















