পাহাড়, চা-বাগান, হালদা নদী, হাজারিখিল অভয়ারণ্য-প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ উপজেলার নাম ফটিকছড়ি। এর সঙ্গে আছে দেশের অন্যতম আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, সুফি ধারার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ।
‘স্বনির্ভর চট্টগ্রাম (চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি): চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনায় ফটিকছড়ির নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে এই উপজেলার উন্নয়নের বাস্তব দৃশ্য, সম্ভাবনার দিগন্ত এবং বাস্তব চ্যালেঞ্জের এক বিস্তৃত চিত্র। আয়তনের দিক থেকে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় এই উপজেলা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, কাঠামোগত ঘাটতি কাটিয়ে কীভাবে টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটবে-তারই একগুচ্ছ দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা দেন তারা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্পায়ন, পর্যটন ও নারী উন্নয়ন- সব ক্ষেত্রেই নতুন করে চিন্তা ও উদ্যোগের আহ্বান আসে এই সেমিনারে, যা ফটিকছড়ির ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ভাবনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
জাহানারা মমতাজ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পল্লবী খাস্তগীরের সঞ্চালনায় ১৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক পূর্বকোণে ইউসুফ চৌধুরী কনফারেন্স হলে আয়োজিত এই সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন দৈনিক পূর্বকোণের চিফ রিপোর্টার সাইফুল আলম। ফটিকছড়ির সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া, ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম, বিজিএমইএ’র সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী, নাজিরহাট বাজার আদর্শ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. নাছির উদ্দীন চৌধুরী, উপজেলা কৃষি অফিসার আবু সালেক, আইনজীবী এডভোকেট আব্দুল্লাহ আল ফাহিম।
স্বাগত বক্তব্যে পূর্বকোণের চিফ রিপোর্টার সাইফুল আলম বলেন, চট্টগ্রামের সংসদীয় আসনভিত্তিক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করার মূল উদ্দেশ্য হলো-প্রতিটি এলাকা কীভাবে স্বনির্ভর করা যায়, সেই চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করা। এজন্যেই প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণের সমস্যাগুলো জানতে আপনাদেরকে এখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।’
বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘এখন সময় এসেছে বিক্ষিপ্ত উন্নয়ন নয়Ñপরিকল্পিত, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করার। ফটিকছড়ির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য-চা বাগান, পাহাড়, নদী এবং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হাজারিখিল। এগুলোকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। পাশাপাশি মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় পর্যটনও বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র।’ হালদা নদীকে শুধু একটি নদী নয়, বরং একটি পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘হালদার পানি ও মাটির বিশেষ গুণাগুণ কৃষিপণ্যের স্বতন্ত্রতা তৈরি করেছে- যেমন হালদার মুলা, মরিচ ও বেগুন, যা জাতীয়ভাবে ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগ রাখে। একই সঙ্গে রাবার ড্যামসহ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে পুনর্বিবেচনা এবং বিকল্প কৃষি পরিকল্পনার ওপর জোর দিতে হবে। ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া নার্সিং ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার ও নারী কর্মসংস্থানভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি পরিকল্পিত ইপিজেড, রেললাইন সম্প্রসারণ এবং স্থলবন্দর ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বেকারত্ব দূরীকরণে প্রবাসমুখী জনশক্তিকে দক্ষ করে বিদেশে পাঠানোর জন্য প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও করতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘ফটিকছড়ি একটি বিশাল সম্ভাবনাময় উপজেলা। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদি কমিটমেন্ট।’
তিনি বলেন, চা বাগান এলাকায় মানসম্মত শিক্ষা, বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম বিকল্প পথে যেতে পারে।’
প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে কাক্সিক্ষত উচ্চমান অর্জন সম্ভব হচ্ছে না উল্লেখ করে ফটিকছড়ির ইউএনও সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা চালু করলে রপ্তানিযোগ্য মানের রাবার উৎপাদন সম্ভব হবে।’
অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম ব্রিজ, রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। সব জায়গায় গার্মেন্টস শিল্প না এনে পরিবেশ, অবকাঠামো ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিল্প স্থাপন করতে হবে বলে মত দেন তিনি।
পর্যটন খাতকে ফটিকছড়ির বড় সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘চা বাগান, রাবার বাগান ও মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফকে কেন্দ্র করে ফটিকছড়িকে ব্র্যান্ডিং করা সম্ভব। ভালো হোটেল ও রিসোর্ট না থাকায় পর্যটন বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘ফটিকছড়ি একটি বৃহৎ উপজেলা, তাই কার্যকর প্রশাসন ও সেবার জন্য এটিকে যৌক্তিকভাবে বিভক্ত করা জরুরি। বেকারত্ব দূরীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রবাসগামীদের জন্য ৬ মাসের ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ চালু করলে তারা দক্ষ হয়ে বেশি আয় করতে পারবে। একইভাবে দেশে শিল্পায়নের জন্য পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে পর্যায়ক্রমে উদ্যোক্তাদের প্লট বরাদ্দ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাবে।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কনসালটেন্ট (শিশু) ডা. জয়নাল আবেদীন মুহুরী বলেন, ‘ফটিকছড়ির এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত সীমিত ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও প্রয়োজনীয় জনবল, অবকাঠামো ও সরঞ্জাম সেই অনুযায়ী বাড়ানো হয়নি। পুরনো জরাজীর্ণ ভবনে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবল সংকট- ডাক্তার ছাড়াও নার্স, ওয়ার্ড বয়, আয়া, সুইপার- প্রয়োজনীয় সহায়ক কর্মী নেই। অনেক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য, ফলে সেবা ব্যাহত হচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং তাদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কমাতে হবে।
নাজিরহাট বাজার আদর্শ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. নাছির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, গ্রামে শিক্ষার মান এখনও সন্তোষজনক নয়। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী পড়ালেখায় আগ্রহ হারাচ্ছে, আর যাদের সামর্থ্য আছে তারা চট্টগ্রাম শহরে চলে যাচ্ছে ভালো শিক্ষার আশায়। ফলে গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থা পিছিয়ে পড়ছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার আবু সালেক বলেন, ‘ফটিকছড়ি একটি কৃষিভিত্তিক সম্ভাবনাময় অঞ্চল, যেখানে এখনো অধিকাংশ জমি শিল্পায়নের বাইরে রয়েছে- এটাই কৃষির সবচেয়ে বড় শক্তি। হালদা নদীর পানি, পাহাড়ি ছড়া, চর অঞ্চল ও উর্বর মাটি- সব মিলিয়ে এখানে কৃষির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে কাঁঠাল, মিষ্টি আলু, ফলবাগান (কাজু, কফি, ড্রাগন, মাল্টা) এবং সবজি উৎপাদনে ফটিকছড়ি এগিয়ে। তবে বড় সমস্যা হলো- কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। কাঁঠাল বা অন্যান্য ফসলের ভ্যালু অ্যাডিশন (প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প) গড়ে উঠলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং কৃষকের লাভ নিশ্চিত হবে।’
আইনজীবী এডভোকেট আব্দুল্লাহ আল ফাহিম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে থাকা সত্তে¡ও এখানে কোনো ইপিজেড নেই, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘাটতি। প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামোগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও শিল্পায়ন হয়নি। এখানে বড় জনসংখ্যা থাকলেও বিনোদন বা ক্রীড়া সুবিধা নেই- কোনো সরকারি পার্ক, ইনডোর গেমস বা ক্রীড়া কমপ্লেক্স নেই। বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স এলেও প্রবাসীদের জন্য স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ বা সহায়ক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, ফলে তাদের শহরে গিয়ে সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
পূর্বকোণ/এএইচ
















