পার্বত্য এলাকা অস্থির হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে একের পর এক হত্যা এবং পাল্টা হত্যাকাণ্ড চলছে। এছাড়া গ্রুপগুলো প্রায়শই বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। গত তিন মাসে এ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর ছয়জন হত্যার শিকার হয়েছে। এরমধ্যে চারটি হত্যাকাণ্ডই সংঘটিত হয়েছে খাগড়াছড়িতে । সর্বশেষ গত শনিবার রাঙ্গামাটির সাজেকে প্রতিপক্ষের গুলিতে খুন হন হেগেরা চাকমা (৪৯) নামে এক ব্যক্তি। তিনি প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সদস্য বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সোমবার (আজ) খাগড়াছড়ির দিঘিনালা-সাজেক-বাঘাইছড়ি সড়কে আধাবেলা অবরোধের ডাক দিয়েছে তারা। এ হত্যাকাণ্ডের মাত্র একদিন আগে পানছড়ির ইসলামপুরে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হয় ইমন হোসেন নামে একজনকে। তিনি ইউপিডিএফ- গণতান্ত্রিকের কর্মী ছিলেন। পরপর সংঘটিত এ দুটি হত্যাকাণ্ডের জন্য উভয় সংগঠন একে-অপরকে দায়ী করেছেন। এরআগে গত ৭ মার্চ পানছড়ির বড়কোনা এলাকায় আপন ত্রিপুরা প্রকাশ সংগ্রাম নামে প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের সদস্য খুন হন। এই হত্যার ঘটনার জন্য সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস) দায়ী করে ইউপিডিএফ।
৮ এপ্রিল খাগড়াছড়ি জেলা সদরের আকবারি এলাকায় গুলিতে নিহত হন নিউটন চাকমা নামে ইউপিডিএফের আরেক সদস্য। ১৭ এপ্রিল খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কের কুতুবছড়ি নামক এলাকায় প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের সমর্থিত যুব ফোরামের সহ সভাপতি ধর্ম শিং চাকমাকে তার বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়। ইউপিডিএফ এ হত্যাকাণ্ডের জন্য জেএসএসকে (সন্তু লারমা গ্রুপ) দায়ী করে বিক্ষোভ সমাবেশ, সড়ক অবরোধ ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করে। ২৭ মার্চ পানছড়ির মানিক্যপাড়ায় প্রতিপক্ষের গুলিতে খুন হন ইউপিডিএফ- গণতান্ত্রিকের উপজেলা সহ-সভাপতি নীতি দত্ত চাকমা। এভাবে একের পর এক পাল্টা পাল্টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ভয় ও আতংক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিচরণ এলাকার স্থানীয় গ্রামবাসীরা নিজেদের প্রাণের নিরাপত্তা নিয়ে সার্বক্ষণিক শঙ্কায় দিনাতিপাত করতে হয়।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, ‘মূলত আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একের পর এক পাল্টাপাল্টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করছে। প্রায়শই তারা লিপ্ত হচ্ছে বন্দুকযুদ্ধে। তাদের এই আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম মূল লক্ষ্য বিভিন্ন উৎস থেকে চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাহাড়ি জন প্রতিনিধি বলেন, ‘পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন নামে যেসব সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে তাদের আদর্শিক দ্বন্দ্ব তেমন কিছু নেই। মূল বিষয়টা হচ্ছে আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজি। বিভিন্ন গ্রুপ মিলে বছরে ৬-৭শ কোটি টাকার চাঁদাবাজি করা হয়। এই অবারিত চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্যই বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।’
জানা যায়, দুই দশক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সই হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার সঙ্গে এই চুক্তি সই হয়। খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে প্রায় ২ হাজার সশস্ত্র বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন সন্তু লারমা। ওই চুক্তির বিরোধিতা করে জনসংহতি সমিতির সহযোগী ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের একটি অংশ ১৯৯৮ সালের জুনে সন্তু লারমার সংগঠন থেকে বের হয়ে প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গঠন করে।
২০১০ সালে সন্তু লারমার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে সুধাসিন্ধু খীসা ও তারিন্দ্র লাল চাকমার (পেলে) নেতৃত্বে জন্ম হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা গ্রুপ) নামে পাহাড়ে আরেক নতুন সংগঠন। সর্বশেষ ২০১৭ সালের নভেম্বরে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ভেঙে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে আরেকটি নতুন সংগঠন জন্ম নেয়। এ নিয়ে এখন পাহাড়ে চারটি আঞ্চলিক সংগঠনের তৎপরতা রয়েছে।
খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান উষ্যেপ্রু মারমা বলেন, সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে চলমান খুনাখুনি, সহিংসতা পাহাড়কে বিষিয়ে তুলছে। তাদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে প্রত্যন্ত এলাকার নিরীহ সাধারণ মানুষ ভয়-আতংকে এক রকম শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় আছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার পার্বত্য এলাকার বিবদমান সংঘাত-সহিংসতা বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
চলমান বিবদমান সংঘাত-সহিংসতা নিয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলেও কোন পক্ষই বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি। তবে গত শনিবার সাজেকে নিজ সংগঠনের সদস্য হেগেরা চাকমার হত্যার ঘটনায় সংবাদ মাধ্যমে দেয়া বিবৃতিতে ইউপিডিএফের জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা দাবি করেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে খুনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।’
খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) মো. মিজানুর রহমান, পিপিএম বলেন, ‘আঞ্চলিক সশস্ত্র গ্রুপগুলোর সংঘাত ও সহিংসতার বিরুদ্ধে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সর্বদা তৎপর। যৌথ অভিযানও পরিচালনা করা হয়।


















