একটি দেশের সংস্কৃতি শুধু গান, কবিতা, নাটক, নৃত্য কিংবা বিনোদনের আয়োজনের সমষ্টি নয়; সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস, জীবনবোধ ও চিন্তা-চেতনার প্রতিচ্ছবি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হলো সংস্কৃতি। একটি সমাজ কীভাবে আনন্দ করে, শোক প্রকাশ করে, অন্যকে সম্মান করে, ধর্ম ও মানবতাকে ধারণ করে এবং ভিন্নমত ও বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করে এসবের মধ্যেই তার সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রকাশ পায়। তাই সংস্কৃতির প্রশ্ন নিছক বিনোদনের প্রশ্ন নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রশ্ন।
সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাব আয়োজিত এক কাওয়ালি সন্ধ্যায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন সংস্কৃতি চর্চাকে লালন ও পরিচর্যা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে কাওয়ালির মতো সুফিধারার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব বিশেষভাবে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রভাব গভীর হলেও সেই মূল্যবোধকে সংকীর্ণতা ও বিভাজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রেম, মানবতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সঙ্গে যুক্ত করার ঐতিহ্যও আমাদের রয়েছে। সুফিসংস্কৃতি সেই মানবিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাহক।
সংস্কৃতি কোনো স্থির বিষয় নয়। সময়ের সঙ্গে এটি পরিবর্তিত হয়, নতুন উপাদান গ্রহণ করে এবং পুরোনো ঐতিহ্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে। তবে পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু মৌলিক মূল্যবোধ অটুট থাকা প্রয়োজন। মানবিকতা, সত্যনিষ্ঠা, ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা, পরস্পরের প্রতি সম্মান, ধর্মীয় সহনশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা এসব মূল্যবোধ হারিয়ে গেলে সংস্কৃতি যতই চাকচিক্যময় হোক, তার অন্তর্গত শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই আমাদের এমন সংস্কৃতি প্রয়োজন, যা মানুষকে শুধু আনন্দ দেবে না; একইসঙ্গে মানুষকে মানবিক হতে উদ্বুদ্ধ করবে।
কাওয়ালি এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। উপমহাদেশের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সুফিসংগীত মানুষের অন্তর্জগতকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। প্রেম, আত্মসমর্পণ, স্রষ্টার প্রতি আকর্ষণ, মানবিক সম্পর্ক ও আধ্যাত্মিকতার নানা মাত্রা কাওয়ালির কথামালা ও সুরে প্রকাশ পেয়েছে। এটি ধর্মীয় অনুভ‚তিকে মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে যুক্ত করে এবং ভয় ও বিভাজনের পরিবর্তে প্রেম, সম্প্রীতি ও আত্মিক সংযোগকে সামনে আনে। তাই কাওয়ালিকে কেবল একটি সংগীতধারা হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে ছোট করে দেখা হবে। প্রসঙ্গত, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িকতার মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধ মানুষের মধ্যে ন্যায়, সংযম, দয়া, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে পারে। অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িকতা মানে ধর্মহীনতা নয়; বরং প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ ধর্ম ও বিশ্বাস নিয়ে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা।
যে সংস্কৃতি এই দুই মূল্যবোধকে পাশাপাশি ধারণ করতে পারে, সেটিই একটি সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে। এ কথা স্বীকার করতেই হবে, বাংলাদেশের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার বৈচিত্র্য। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, মুর্শিদি, মারফতি, কাওয়ালি, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র, চারুকলা ও লোকজ উৎসব সব মিলিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহুস্তরীয়।
এই বৈচিত্র্যের কোনো একটি অংশকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন ধারার সহাবস্থানই আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই সাংস্কৃতিক বহুত্বকে সম্মান করা প্রকৃত সাংস্কৃতিক পরিপক্কতার পরিচয়। তবে সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের সমাজে দুটি বিপরীত প্রবণতা দেখা যায়। একদিকে বাজারনির্ভর বিনোদন সংস্কৃতিতে জনপ্রিয়তা, দ্রুত দর্শক আকর্ষণ ও বাণিজ্যিক সাফল্য অনেক সময় প্রধান বিবেচনায় পরিণত হয়। অন্যদিকে এমন সংকীর্ণ মানসিকতাও রয়েছে, যা সংস্কৃতির বহুত্ব, সৃজনশীলতা ও ঐতিহ্যের স্বাভাবিক বিকাশকে সন্দেহের চোখে দেখে।
এই দুই চরমতার মাঝখানে প্রয়োজন ভারসাম্যের একটি সুস্থপথ। সংস্কৃতিকে অন্ধভাবে বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি ধর্মীয় বা নৈতিকতার নামে সংস্কৃতিকে সংকুচিত করাও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সৃজনশীল স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়িত্ব পাশাপাশি থাকবে। বিশেষ করে তরুণপ্রজন্মের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে বিশ্বের নানাপ্রান্তের সাংস্কৃতিক উপাদান মুহূর্তের মধ্যে মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এটি যেমন বড় সুযোগ, তেমনি ঝুঁকিও রয়েছে। অ্যালগরিদম-নির্ভর বিনোদন অনেক সময় দ্রুত উত্তেজনা, চমক, বিতর্ক ও জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেয়। ফলে গভীরতা, ইতিহাস, নৈতিকতা ও নান্দনিকতার জায়গা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই বাস্তবতায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব বেড়ে গেছে।
আজকের শিশুরাই আগামির বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে। তাই শিশু-কিশোরদের শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা প্রযুক্তিগত দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করতে হবে। একটি গান কেন গুরুত্বপূর্ণ, একটি কবিতা কীভাবে মানুষের চিন্তা বদলে দিতে পারে, একটি নাটক কীভাবে সামাজিক অন্যায়কে প্রশ্ন করতে পারে কিংবা একটি লোকগান কীভাবে একটি অঞ্চলের ইতিহাস বহন করে এসব জানার সুযোগ তাদের দিতে হবে। সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় মানে কেবল শিল্পী তৈরি করা নয়; বরং সংবেদনশীল, চিন্তাশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা।
এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয় ও কলেজের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনেক সময় জাতীয় দিবসকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ সাংস্কৃতিক শিক্ষা হওয়া উচিত ধারাবাহিক। শিক্ষার্থীদের স্থানীয় ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ইতিহাস, বাংলাসাহিত্য, সংগীত ও নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ভিন্নসংস্কৃতি ও ভিন্নমতের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহনশীলতা, উদারতা ও যুক্তিবোধ গড়ে উঠবে। গণমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। সংবাদমাধ্যম শুধু সংবাদ পরিবেশন করে না; এটি সমাজের রুচি ও আলোচনার ক্ষেত্রও তৈরি করে।
টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যদি মানসম্পন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকজঐতিহ্য, তরুণশিল্পীদের কাজ এবং মূল্যবোধসম্পন্ন বিনোদনকে জায়গা দেয়, তবে সাংস্কৃতিক পরিসর আরও সমৃদ্ধ হবে। জনপ্রিয়তার অজুহাতে অশালীনতা, বিদ্বেষ, গুজব বা বিভাজনকে উৎসাহিত করা থেকে গণমাধ্যমকে বিরত থাকতে হবে। সরকারের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে সংস্কৃতি স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে পারে এবং মানুষের মৌলিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করতে পারে। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন, শিল্পীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা, স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ, গ্রাম ও শহরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভারসাম্য এবং তরুণদের জন্য সাংস্কৃতিক অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে কার্যকর নীতি প্রয়োজন।
শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক আয়োজন দিয়ে দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের সংস্কৃতির দিকে আরও নজর দেওয়া জরুরি। দেশের বহু লোকশিল্পী, বাউল, পালাগান শিল্পী, যাত্রাশিল্পী ও বাদ্যযন্ত্রী জীবিকার সংকটে রয়েছেন। তাঁদের অনেকের জ্ঞান ও দক্ষতা মৌখিকভাবে প্রজন্মান্তরে চলে আসছে। নতুনপ্রজন্ম যদি এসব চর্চা থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে বহু ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে পারে। তাই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ শুধু আর্কাইভ তৈরির বিষয় নয়; জীবিত শিল্পীদের টিকিয়ে রাখাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাওয়ালি সন্ধ্যার মতো আয়োজনও নিয়মিত হওয়া প্রয়োজন। তবে আয়োজনের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, মানও নিশ্চিত করতে হবে।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা প্রচারণার হাতিয়ার না হয়। সেখানে শিল্পীর স্বাধীনতা, ঐতিহ্যের যথাযথ উপস্থাপন, শ্রোতার রুচির প্রতি সম্মান এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি থাকতে হবে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ যেন স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন, সেই পরিবেশও নিশ্চিত করা জরুরি। ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন সংস্কৃতি বলতে কী বোঝায়, সে বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। ধর্মীয় মূল্যবোধকে যদি শুধু বাহ্যিক আচার বা পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে সংস্কৃতির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক তৈরি হবে না।
সত্য, ন্যায়, দয়া, সংযম, প্রতিবেশীর অধিকার, দুর্বল মানুষের প্রতি দায়িত্ব এবং মানুষের মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো মূল্যবোধ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে এসব মানবিক মূল্যবোধ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। একইভাবে অসাম্প্রদায়িকতার অর্থও নতুনপ্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে। অসাম্প্রদায়িক সমাজ এমন একটি সমাজ, যেখানে কেউ নিজের ধর্ম পালন করার কারণে বৈষম্যের শিকার হবে না এবং কেউ অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে অপমানিত বা নিপীড়িত হবে না।
এই নীতি শুধু আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না; এর জন্য সামাজিক সংস্কৃতিও প্রয়োজন। গান, কবিতা, সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্র মানুষের মধ্যে যে সহমর্মিতা তৈরি করতে পারে, তা অনেক সময় বক্তৃতার চেয়েও শক্তিশালী। বর্তমান বিশ্বে ধর্মীয় বিভাজন, ঘৃণা ও পরিচয়ভিত্তিক সংঘাতের নানা উদাহরণ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিদ্বেষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় মানবিক সংস্কৃতি একটি প্রতিরোধক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। যে তরুণ অন্যের গান শুনতে, সাহিত্য পড়তে এবং ইতিহাস জানতে অভ্যস্থ হয়ে উঠে, সে অন্যকে ঘৃণা করতে পারে না।
সাংস্কৃতিক বিনিময় তাই শুধু বিনোদন নয়; এটি সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠারও একটি কার্যকর উপায়। সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্কও উপেক্ষা করা যাবে না। একজন শিল্পী যদি তাঁর সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে সম্মানজনক জীবিকা অর্জন করতে না পারেন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সংস্কৃতির অনেক শাখা দুর্বল হয়ে পড়বে। সংগীত, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, ডিজিটাল কনটেন্ট, অ্যানিমেশন, নকশা, থিয়েটার ও লোকশিল্পকে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হিসেবেও দেখতে হবে।
দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করলে সংস্কৃতি যেমন টিকে থাকবে, তেমনি তরুণদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি হবে। সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সংকীর্ণতার বাইরে রাখাও জরুরি। মানুষের সংস্কৃতিকে কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তিতে পরিণত করা উচিত নয়। শিল্পীর স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও সৃজনশীলতার পরিসর রক্ষা করতে হবে। একইসঙ্গে শিল্পীরও দায়িত্ব আছে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা। ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্বেষ ছড়ানো, কোনো সম্প্রদায়কে অপমান করা কিংবা সামাজিক বিভাজন উসকে দেওয়া সৃজনশীল স্বাধীনতার সুস্থ ব্যবহার নয়।
আবার মূল্যবোধসম্পন্ন সংস্কৃতির চর্চা শুধু মঞ্চে নয়, দৈনন্দিন জীবনেও প্রতিফলিত হতে হবে। অন্যের মতামত শোনা, ভিন্নমতের মানুষকে সম্মান করা, গুজব না ছড়ানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করা এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এসবও সাংস্কৃতিক আচরণের অংশ। একজন মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে অন্যকে সুযোগ দিলে, পথচারীকে সম্মান করলে কিংবা ভিন্নধর্মের প্রতিবেশীর অধিকারকে স্বীকার করলে সেখানেও সুস্থসংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে। বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রায় ধর্ম, লোকঐতিহ্য, বাংলাভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও সামাজিক সহাবস্থান দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরের সঙ্গে মিশে আছে।
নদী, মাঠ, গ্রাম, শহর, মসজিদ, মন্দির, মাজার, উৎসব, গান ও লোককথা সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ভূগোল। এই ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে বাংলাদেশের পরিচয়কে একমাত্রিক করা সম্ভব নয়। আজ প্রয়োজন সেই বহুত্ববাদী ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন ভাষায় তুলে ধরা। শুধু অতীতের গৌরবের কথা বললেই হবে না; সেই ঐতিহ্য কীভাবে বর্তমান সমাজের সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিও দেখাতে হবে। ধর্মীয় সহনশীলতা, নারী ও শিশুর প্রতি সম্মান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান, প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব, প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সামাজিকভাবে দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো মূল্যবোধ সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের কাছে আরও গভীরভাবে পৌঁছানো সম্ভব।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিদিনের জীবনেই সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে আধুনিকতা থাকবে কিন্তু শিকড় হারাবে না; ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকবে কিন্তু সংকীর্ণতা থাকবে না; অসাম্প্রদায়িকতা থাকবে কিন্তু ধর্মবিদ্বেষ থাকবে না; বিনোদন থাকবে কিন্তু অশালীনতা ও বিদ্বেষের ওপর নির্ভরশীল হবে না; প্রযুক্তি থাকবে কিন্তু মানবিকতা হারাবে না। এই ভারসাম্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, শিল্পী ও নাগরিক সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, একটি প্রজন্মকে আমরা কী গান শোনাব, কী গল্প বলব, কী ইতিহাস শেখাব, কী ধরনের শিল্পের সঙ্গে পরিচিত করব এবং অন্যমানুষের প্রতি কী ধরনের আচরণ করতে শেখাব তার ওপর নির্ভর করবে আগামী দিনের সমাজ কেমন হবে।
তাই এখনই প্রয়োজন সুস্থসংস্কৃতিকে লালন করা, শিল্পীকে সম্মান করা, ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা, তরুণদের সৃজনশীলতার সুযোগ দেওয়া এবং বিভাজনের বদলে মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। সংস্কৃতির শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে তা মানুষ গড়বে, সমাজ বদলাবে এবং একটি সহনশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের পথকে আরও সুদৃঢ় করবে।
আবসার মাহফুজ সাংবাদিক, গ্রন্থকার; নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিটিক্যাল স্টাডিজ এন্ড রিসার্চ (সিপিএসআর)।
[email protected]
পূর্বকোণ/নুসরাত

















