অস্বাভাবিক জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে হালদা নদীর দুই পাড়ের নিম্নাঞ্চল। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন লক্ষাধিক বাসিন্দা। অপরদিকে, নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কারণে ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে লোকালয়। সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র ভাঙনে বিলীন হওয়ার শঙ্কায় রাউজানের আইডিএফ হালদা গবেষণা কেন্দ্র ও ডিএনএ ল্যাব। এটি হালদা নদীর তীরে বিনাজুরী ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত।
প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননের ক্ষেত্র হিসেবে খ্যাত হালদা নদীর প্রতিনিয়ত ভাঙ্গন ও অতিরিক্ত জোয়ারে ভোগান্তির শিকার হয় রাউজান, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও নগরীর মোহরা এলাকার বাসিন্দারা। ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে বসতবাড়ি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি এবং জনপদ। তবে হাটহাজারী ও মোহরা এলাকার কিছু কিছু এলাকায় নদী ভাঙন কিছুটা রোধ করা গেলেও ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে রাউজানের বিস্তীর্ণ এলাকা। বিশেষ করে উপজেলার বিনাজুরী, পশ্চিম গুজরা, উরকিরচর, নোয়াপাড়া, গহিরা, নোয়াজিষপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ ভাঙ্গনের শিকার হচ্ছে। ভাঙনের কবল থেকে বাদ যাচ্ছে না রাউজানের বিনাজুরী আইডিএফ হালদা গবেষণা কেন্দ্র ও ডিএনএ ল্যাব। ভাঙনরোধে আইডিএফ ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিলেও তাতেও রোধ করা যাচ্ছে না ভাঙন।
রুই জাতীয় মাছের দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা রাউজানের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আইডিএফ হালদা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’। তীব্র নদী ভাঙনে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সাম্প্রতিক টানা প্রবল বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং নদীর পানির গতিপথ পরিবর্তনের ফলে প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা বাঁধ, ‘হালদা ডিএনএ টেস্ট কিট গবেষণাগার’, ব্রুড ও নার্সারি পুকুর এবং রেণু উৎপাদনের আধুনিক হ্যাচারিসহ বহুমুখী অবকাঠামো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
হালদা নদীর পাড়ে স্থানীয় ডিম সংগ্রহকারী ও মৎস্যচাষিদের নিবিড়ভাবে সেবা প্রদান, গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি এবং হালদা থেকে সংগৃহীত ডিম হতে শতভাগ বিশুদ্ধ পোনা ও উন্নত ব্রুড মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাউজানের পশ্চিম বিনাজুরিতে এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ)। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় ডিম সংগ্রহকারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, আধুনিক হ্যাচারির মাধ্যমে রেণু উৎপাদন, দেশব্যাপী হালদা পোনার ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়সহ (সিভাসু) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা কার্যক্রম অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পরিচালনা করে আসছে। সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ রাউজান উপজেলা মৎস্য দপ্তর কর্তৃক ‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০২৪’-এ কার্প জাতীয় মাছের রেণু-পোনা উৎপাদনে উপজেলা পর্যায়ে সফল প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি পুরস্কৃত হয়। কিন্ত সাম্প্রতিক ভয়াবহ নদীভাঙন প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বকে চরম সংকটে ফেলেছে।
জানতে চাইলে ভাঙন পরিস্থিতি নিয়ে আইডিএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম পূর্বকোণকে বলেন, ‘হালদা নদীর প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ ও স্থানীয়দের জীবনমান উন্নয়নে নদীর তীরেই এই গবেষণা কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছে। নিজস্ব উদ্যোগে আমরা বারবার ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও পানির তীব্র স্রোতে তা টেকসই হচ্ছে না। দেশের প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ ও গবেষণার স্বার্থে আইডিএফ হালদা গবেষণা কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ (বাপাউবো) সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে আমরা অবিলম্বে স্থায়ী ও কার্যকর নদীভাঙন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছি।’
হালদা নদী গবেষক ও বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া পূর্বকোণকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি ও আইডিএফ শুরু থেকেই যৌথভাবে হালদা কেন্দ্রিক গবেষণায় যুক্ত। দেশি-বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মাঠপর্যায়ের গবেষণার অন্যতম প্ল্যাটফর্ম এই আইডিএফ হালদা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি। আমাদের গবেষণার অন্যতম বড় আবিষ্কার হলো ‘হালদা ডিএনএ টেস্ট কিট, যা দিয়ে মৎস্য চাষিদের জন্য বিনামূল্যে বিশুদ্ধ হালদা পোনা নিশ্চিতকরণে এখানে গবেষণাগার স্থাপন করা হয়েছে। কিন্ত সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির কারণে ডিএনএ ল্যাবের পাড়ে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। ল্যাবটি রক্ষা করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রæত পরিবেশবান্ধব স্থায়ী সুরক্ষামূলক বাঁধ নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐতিহ্য হালদা নদীর ক্ষেত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ড এই নদীর ভাঙ্গন প্রতিরোধে কিছুটা ভিন্নভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে। গতানুগতিক অন্যান্য নদীর কনসেপ্ট এই নদীর জন্য ক্ষতি বয়ে আনবে। হালদা নদীর মৎস্য ঐতিহ্য রক্ষায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে মানুষের বাড়িঘর রক্ষায় কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে দেশে-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। তবেই হালদা নদী রক্ষা পাবে।’
ভাঙন নিয়ে স্থানীয় সুফলভোগীদের মাঝেও ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। প্রবীণ ডিম সংগ্রহকারী ও জাতীয় মৎস্য পদকপ্রাপ্ত কামাল উদ্দিন সওদাগর বলেন, ‘আইডিএফ হ্যাচারি ডিম সংগ্রহকারীদের পরম ভরসার জায়গা। ডিম সংগ্রহ থেকে শুরু করে রেণু ফোটানো ও ন্যায্যমূল্যে পোনা বিক্রিতে কেন্দ্রটি সবসময় আমাদের পাশে থাকে। এই কেন্দ্রটি নদীগর্ভে চলে গেলে আমরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ব।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য মাহবুবুল আলম মেম্বার বলেন, ‘পাহাড়ি ঢলের তোড়ে বিনাজুরির এই অংশে এমন তীব্র ভাঙন আগে কখনো দেখিনি। গবেষণা কেন্দ্রের নিরাপত্তা বাঁধ ইতোমধ্যেই ভেঙে ডিএনএ ল্যাবের কিনারা পর্যন্ত নদী চলে এসেছে। এখনই পরিবেশ উপযোগী ভাঙন না ঠেকালে পুরো প্রতিষ্ঠানটি যেকোনো মুহূর্তে নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে।’
আইডিএফ হালদা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ম্যানেজার মো. নুরুল হাকিম বলেন, ‘তীব্র ভাঙনে ডিএনএ ল্যাব ও হ্যাচারি চরম ঝুঁকিতে পড়ায় স্থানীয় ডিম সংগ্রহকারী, মৎস্যচাষি ও গবেষকদের মাঝে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। ভাঙন রোধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে আমরা স্থানীয় সকল স্টেকহোল্ডারদের গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেছি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুততম সময়ে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধে কাজ শুরু করবে।’
পূর্বকোণ/ইবনুর



















