বিক্ষোভের নামে সহিংসতা-লুটপাট প্রতিহত করতে রাজধানী রোম, মিলানসহ বেশ কয়েকটি শহরে পুলিশের পাশাপাশি ৫ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করেছিল ইতালির সরকার এবং এ কৌশল সফল হয়েছে। শনিবার দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ হলেও সহিংসতা-লুটপাট বা অপ্রীতিকর কোনো ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায়নি।
ইতালির সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এপি জানিয়েছে, শনিবার মিলান, রোম ও তুরিনসহ ইতালির বেশ কয়েকটি শহরের রাস্তায় হাজার হাজার তরুণ-তরুণী মিছিল করেছেন। গত সপ্তাহে একই ধরনের বিক্ষোভে যে সহিংস সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল, তা যেন আর না ঘটে—সেটি নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও সেনা মোতায়েন করেছিল।
তাদের এই উদ্যোগ অনেকাংশেই সফল হয়েছে। মিলানে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও রোম ও তুরিনে অবশ্য পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, তবে সেসব তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়।
ইতালীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিলানে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী রাস্তায় মিছিল করার সময় সেখানে সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল এবং বিলাসবহুল দোকানগুলোর সামনে সুরক্ষামূলক কাঠের আবরণ বসানো হয়েছিল। তবে বিকেলের দিকে বেশিরভাগ দোকানই খুলে দেওয়া হয়।
বিক্ষোভের নামে লুটপাট-সহিংসতা রোধে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে মিলানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েন করা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শাস্তির বিধান আরও কঠোর করা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের সহিংস বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে মিলানে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ বেশ কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে আটক করেছে।
ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক বিশ্বের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকলেও, শনিবার মিলান, রোম, মাদ্রিদ, লিসবন ও তিরানাসহ ইউরোপের অনেক শহরেই বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে।
এই বিক্ষোভগুলোতে শিক্ষা, দুর্নীতি, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, পেনশন এবং আবাসনসহ নানা ধরনের ইস্যু উঠে এসেছে।
মিলানে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মূলত তরুণ-তরুণীদের একটি বিশাল জনসমাবেশ গড়ে ওঠে। তারা প্রধানমন্ত্রী মেলোনির বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেয় এবং ‘রাষ্ট্রের মিথ্যাচার মানি না’ লেখা সম্বলিত ব্যানার বহন করে।
স্থানীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ফুটেজে একদল বিক্ষোভকারীকে ইতালির জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যালয়ের সামনে গোবর ফেলতে এবং প্রতীকী হিসেবে একটি বড় আকৃতির বৈদ্যুতিক বিলবোর্ড পুড়িয়ে ফেলতে দেখা গেছে। ওই বিলবোর্ডে সরকারের সাফল্য উল্লেখ করা ছিল।
ইতালির প্রধান আর্থিক কেন্দ্র এবং সবচেয়ে সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক শহর মিলানে আগে থেকেই সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। শনিবার তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও ৫০০ সেনা। এই সেনারা মিলানে মোতায়েন প্রায় ৫ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতা করেছেন। কর্তৃপক্ষ ড্রোন নজরদারি, রেলওয়ে স্টেশনে তল্লাশি, র্যাপিড রেসপন্স ইউনিট (আরআরইউ) মোতায়েন এবং সহিংসতার উসকানি শনাক্ত করতে অনলাইনে নজরদারি চালিয়েছে।
ইতালীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মিলানের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেওয়া পিয়েরফ্রান্সেস্কো মাজোরিনো শনিবারের মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি ২০২৭ সালের শুরুর দিকে মধ্য-বামপন্থী জোটের প্রাইমারি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। মিলানের বর্তমান মধ্য-বামপন্থী মেয়র জিউসেপ্পে সালা, যিনি ২০১৬ সাল থেকে এই দায়িত্বে আছেন, তিনি আর নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না।
মিলানের ফ্যাশন ডিস্ট্রিক্টে অবস্থিত ওমেগা (Omega), টিফানি (Tiffany) ও গুচি (Gucci)-সহ অনেক বিলাসবহুল দোকানের সামনের কাঁচের জানালাগুলো কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। অ্যাপল স্টোরটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং শনিবার সন্ধ্যায় অন্যান্য দোকান পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও এটি বন্ধই ছিলো।
গত সপ্তাহান্তে দাঙ্গাকারীরা শহরের কেন্দ্রীয় দুওমো স্ক্যায়ারের পার্শ্ববর্তী সড়কগুলোতে অবস্থিত বিভিন্ন দোকানে ঢুকে স্নিকার্স, খেলাধুলার পোশাক এবং বিভিন্ন ক্রীড়া সামগ্রী লুটপাট করে।
প্রতিবাদকারীরা শহরের অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেবল শহরের কেন্দ্রস্থলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বিস্তৃত করা হয়েছিল।
শনিবার সন্ধ্যায় প্রতিবাদকারীরা শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে ৩ কিলোমিটারেরও (২ মাইল) বেশি দূরে অবস্থিত মিলান পলিটেকনিকের সামনে এসে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের মিছিল শেষ করেন।
মিলান পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় প্রায় ২ হাজার তরুণ প্রতিবাদকারী জড়িত ছিল। এদের মধ্যে অনেকেই বিদেশি নাগরিক, আবার অনেকে ইতালির নাগরিকত্ব পাওয়া দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী। দুই দিনে পুলিশ ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে ৩৪ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
‘ইন্টার মিলান’ ফুটবল ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত কিছু উগ্র ডানপন্থী লোকজন—যাদের অনেকে গুণ্ডা প্রকৃতির—সেখানে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য উপস্থিত হয়ে অভিবাসী ও মুসলিমবিরোধী স্লোগান দেয়। তবে পুলিশ দ্রুত তাদের অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো জানিয়েছেন, শনিবার যে সৈন্যদের মোতায়েন করা হয়েছে, তাদের কেবল সম্প্রতি ‘প্লাস্টিক রেস্ট্রেইন্ট টাই’ (হাত বাঁধার প্লাস্টিক ব্যান্ড) ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এটি কেবল রেল স্টেশনগুলোর আশপাশের এলাকাতেই সীমাবদ্ধ, পুরো শহরে নয়। তিনি আরও জানান, তাদের কাছে পিপার স্প্রে বা টেজার (বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র) রাখার কোনো অনুমতি নেই।
রোমেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সেখানে কর্তৃপক্ষ বিলাসবহুল কেনাকাটার রাস্তাগুলো বন্ধ করে দিয়েছে এবং সার্কাস ম্যাক্সিমাস ও পিয়াজ্জা দেল পোপোলো এর আশেপাশে নজরদারি বাড়িয়েছে।
সূত্র : এপি, এনডিটিভি
পূর্বকোণ/আদর


















