পশ্চিমবঙ্গের বুকে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার হরণের প্রক্রিয়া তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কলকাতার ঐতিহাসিক ‘রেড রোড’-এ ঈদের নামাজকে নিরাপত্তা ও যানজটের অযুহাতে নিষিদ্ধ করা হলেও, দুর্গাপূজা এবং আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের মতো অনুষ্ঠানের জন্য দিনের পর দিন প্রধান সড়কটি বন্ধ রাখার ঘটনায় শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভ।শহর খুঁজুন
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্গাপূজার মহালয়া উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন মেগা ইভেন্ট, সাজসজ্জা, ৩,০০০ ঢাকির প্রদর্শনী এবং অন্যান্য পরিকাঠামো তৈরির জন্য লালবাজার পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন মঙ্গলবার থেকে ১১ই অক্টোবর ভোর পর্যন্ত—অর্থাৎ টানা চার দিন ধরে রেড রোড সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
মঙ্গলবার কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ এক নির্দেশিকা জারি করে জানিয়েছেন, ৬ অক্টোবর রাত ১০টা থেকে রেড রোডে যান চলাচল বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এই নির্দেশিকা ২৪ ঘন্টা কার্জকর থাকবে। আবার ৯ তারিখ মাঝরাত থেকে ১০ অক্টোবর গভীর রাত অথবা ১১ অক্টোবর ভোর পর্যন্ত বন্ধ থাকবে এই রাস্তা।
বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, উৎসবের মরসুমে শহরের সার্বিক যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কেবল রেড রোড সংলগ্ন এলাকা নয়, প্রয়োজনমতো অন্যান্য সংযোগকারী রাস্তা থেকেও কর্মরত ট্রাফিক পুলিশ যানবাহন অন্য পথে ঘুরিয়ে দিতে পারবে।ক্যাম্পেইন দেখুন
এর আগে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার রেড রোড টানা সাত দিন বন্ধ রাখার বন্দোবস্ত করে। তৎকালীন দ্বাদশ আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের মূল অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং কলকাতায় হাজির হন। তিনি রেড রোডে তৈরি করা সুবিশাল মঞ্চে উপস্থিত থেকে হাজার হাজার মানুষের সামনে যোগব্যায়াম ও আসন প্রদর্শন করেন। সেসময় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও তৎকালীন গভর্নর তাঁর সাথে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
রাজভবন, কলকাতা হাইকোর্ট ও বিধানসভার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সংযোগকারী ব্যস্ততম এই সড়কটি দিনের পর দিন আটকে রেখে ক্ষমতাবানদের ক্ষমতার আস্ফালন প্রদর্শিত হলেও সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি নিয়ে হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন কোনো ভ্রুক্ষেপই করেনি।
কলকাতার রেড রোডে ১৯১৯ সাল থেকে দীর্ঘ ১০৭ বছর ধরে প্রতি বছর ঈদের দিনে নিয়ম করে ১ ঘণ্টার ঐতিহ্যবাহী ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তবে সম্প্রতি নিরাপত্তা ও যানজটের অযুহাতে এবার প্রথম সেখানে মুসলিমদের নামাজের অনুমতি দেওয়া হয়নি, যার বদলে তাদের ময়দানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাত্র এক ঘণ্টার ঈদের জামাতের অনুমতি না মেলা বনাম পূজার প্রস্তুতি ও যোগাসনের নামে দিনের পর দিন প্রধান সড়ক বন্ধ রাখার এই দ্বিচারিতায় পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় সাধারণ মানুষ, অধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দলীয় নেতারা প্রশ্ন তুলছেন—যেখানে সংখ্যালঘু মুসলিমদের শতাব্দীর পুরোনো একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য মাত্র ১ ঘণ্টার অনুমতি মেলেনি, সেখানে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে দিনের পর দিন পথ আটকে রাখা কি ধরনের ধর্মনিরপেক্ষতা?
অধিকারকর্মীদের মতে, এটি স্রেফ কোনো সাধারণ যান নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; বরং সুপরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং রাজ্যজুড়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীভিত্তিক পক্ষপাতিত্ব কায়েম করার নগ্ন মহড়া।
পূর্বকোণ/আদর



















