গুম যাই কাঝা গইজ্জি ফজর
এত্তেও ন উঠি যেত্তে জোওর
হেলায় আর কেলায় গেইয়ি আছর
মইরবোর ঐ উনি আঝান
নামাঝ ফইরতে যাছো না ওঠা
জামাতোন এহনও আছে জাগা।
-কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা’ কবিতার একটি স্তবকের আমার করা চাটগাঁইয়া অনুবাদ।
২০০৭ সালে চাটগাঁইয়া ভাষার জন্য আন্তর্জাতিক ভাষা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ISO 639-3-এ পৃথক কোড ‘ctg’ অনুমোদিত হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাষাতাত্তি¡ক তথ্যভান্ডার Glottolog-এও এটি ইন্দো-ইউরোপিয়ান পরিবারের একটি পৃথক ভাষা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয় (Glottocode: chit1275)। ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও চাটগাঁইয়ার স্বতন্ত্র ভাষাগত বৈশিষ্ট্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। চাটগাঁইয়া ভাষার নিজস্ব শব্দভান্ডার, উচ্চারণ, বাক্যগঠন, প্রবাদ, গান, ব্যাকরণ ও লোকসাহিত্য রয়েছে।
এর কিছুদিন পর বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি আয়োজনে যোগ দিতে যাওয়ার পথে নিতান্ত শখের বশে নজরুলের কবিতার এই স্তবকটি চাটগাঁইয়া ভাষায় অনুবাদ করি ও অনুষ্ঠানে পড়ে শুনিয়েছি। অনুবাদ করতে গিয়ে বুঝেছি, শুধু শব্দের অর্থ বদলালেই কবিতার অনুবাদ হয় না। মূল কবিতার ভাব ও ছন্দের সঙ্গে নিজের ভাষার স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গিও ধরে রাখতে হয়।
অনেকে প্রশ্ন তোলেন, চাটগাঁইয়ার নিজস্ব লিপি নেই, তাহলে এটি স্বতন্ত্র ভাষা হয় কীভাবে? অথচ স্বতন্ত্র ভাষার জন্য পৃথক লিপি থাকা বাধ্যতামূলক নয়। ইংরেজি, ফরাসি ও স্প্যানিশ একই লিপি ব্যবহার করে। মালয়, ইন্দোনেশীয় ও সোয়াহিলিও প্রধানত রোমান লিপিতে লেখা হয়। চাটগাঁইয়া বাংলা লিপিতে লেখা হয়, যা ইউনিকোডে সমর্থিত।
পঞ্চদশ শতকে গুটেনবার্গের ছাপাখানা জ্ঞান বিস্তারের নতুন সুযোগ তৈরি করে। পরে কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও ইউনিকোড ভাষার ডিজিটাল ব্যবহারকে সহজ করেছে। কিন্তু যে সব ভাষা এই দুই জায়গায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে নি তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা ততো কমেছে।
এখন এআই মানুষের ভাষা বুঝতে, অনুবাদ করতে, এমনকি কথা বলতেও পারে। কিন্তু সব ভাষা এই সুবিধা সমানভাবে পাচ্ছে না, পাবেও না। যেসব ভাষার ডিজিটাল উপকরণ কম, এআই-এর জগতেও সেগুলো পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে।
চাটগাঁইয়া বিশ্বের আনুমানিক এক কোটি ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষের জীবন্ত ভাষা। অথচ এর অনেক সাহিত্যকর্ম, গান, গল্প ও লোকজ উপাদান এখনও ডিজিটাল আকারে সংরক্ষিত হয়নি। কথ্য ভাষার নমুনা এবং যাচাই করা অনুবাদের উপকরণও পর্যাপ্ত নয়।
সম্প্রতি চাটগাঁ ভাষা পরিষদের সঙ্গে যুক্ততার পর নজরুলের কবিতার সেই অনুবাদের কথা মনে পড়ল। এআই কি এই চাটগাঁইয়া ভাষার উন্নয়নের কাজে সাহায্য করতে পারে?
খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম, কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। Vashantor, ChatgaiyyaAlap ও Kothon-এর মতো গবেষণা উদ্যোগে চাটগাঁইয়া ভাষার ডেটাসেট ও অনুবাদ নিয়ে কাজ হয়েছে। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা-চাটগাঁইয়া কথ্য ভাষার অনুবাদ নিয়েও গবেষণা চলছে।
আমি নিজেও চ্যাটজিপিটি দিয়ে নজরুলের কবিতা অনুবাদের পরীক্ষা করেছি। প্রথমে অনেক ভুল করলেও আমার সংশোধনের পর একই কথোপকথনে তার অনুবাদ কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে এআই স্থায়ীভাবে ভাষাটি শিখে ফেলেছে। নির্ভরযোগ্য ভাষাপ্রযুক্তির জন্য প্রয়োজন সংগঠিত ও যাচাই করা ভাষাগত উপকরণ। আর এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে নানা উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
প্রথমত, চাটগাঁইয়া ভাষার একটি ডিজিটাল সংগ্রহশালা গড়ে তোলা। বই, কবিতা, গান, গল্প, প্রবাদ ও লোকসাহিত্য সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে হবে। লেখক ও স্বত্বাধিকারীদের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কথ্য ভাষার নমুনা সংগ্রহ জরুরি। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার মানুষের উচ্চারণ, কথোপকথন ও গল্প তাঁদের সম্মতি নিয়ে রেকর্ড করতে হবে। আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, গবেষকদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। ইতিমধ্যে তৈরি ডেটাসেট ও গবেষণার ফলাফল যথাযথভাবে ভাগাভাগি করতে হবে, যাতে নতুন উদ্যোগগুলো আগের কাজের ওপর ভিত্তি করে এগোতে পারে।
চতুর্থত, সাধারণ ভাষাভাষীদের যুক্ত করতে হবে। তাঁরা শব্দ, বাক্য, উচ্চারণ ও অনুবাদের উদাহরণ দিতে পারেন। এসব উপকরণ যাচাই করে গবেষণার উপযোগী ডেটাসেট তৈরি করা সম্ভব।
পঞ্চমত, চাটগাঁইয়া ভাষায় একটি স্বতন্ত্র উইকিপিডিয়া সংস্করণ চালুর উদ্যোগ নেওয়া। এজন্য নিয়মিত লেখক ও সম্পাদকদের একটি সম্প্রদায় গড়ে তুলতে হবে এবং উইকিমিডিয়ার নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এর মাধ্যমে চাটগাঁইয়া ভাষায় জ্ঞানচর্চার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
এবং গবেষণাকে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিতে রূপ দিতে হবে। বাংলা-চাটগাঁইয়া অনুবাদ, কথাকে লেখায় রূপান্তর, কথ্য ভাষার অনুবাদ এবং ভবিষ্যতে চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলতে সক্ষম এআই ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এই কাজগুলো সমন্বয়ে চাটগাঁ ভাষা পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা নিতে পারে। গবেষক, ভাষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ, সাহিত্যিক ও সাধারণ ভাষাভাষীদের একত্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব। এই কাজে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিতে এগিয়ে আসতে পারেন চট্টগ্রামের গুণীজনেরা।
চাটগাঁইয়া ভাষা এআই যুগে কতটা জায়গা করে নিতে পারবে, তা শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে আমরা আমাদের ভাষাকে এই প্রযুক্তির জগতে কতটা জায়গা করে দিতে পারি, তার ওপরও।
লেখক: প্রকৌশলী, বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সভাপতি এবং চাটগাঁ ভাষা পরিষদ, ঢাকা শাখার সাধারণ সম্পাদক।
(৩১ অক্টোবর ২০২৬ চাটগাঁ ভাষা পরিষদ আয়োজিত সেমিনারে উপস্থাপিত নিবন্ধের ভিত্তিতে, সংক্ষেপিত)
পূর্বকোণ/ইবনুর


















