চট্টগ্রাম রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬

ঘরে মিষ্টির উৎসব হওয়ার কথা ছিল, হলো কান্না...

ঘরে মিষ্টির উৎসব হওয়ার কথা ছিল, হলো কান্না…

তাসনীম হাসান

১ নভেম্বর, ২০২৬ | ১২:০৫ অপরাহ্ণ

ঘরে মিষ্টি থাকার কথা ছিল। মেয়ের ফল প্রকাশের আনন্দে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, শুভেচ্ছা আর হাসিতে মুখর হওয়ার কথা ছিল বাড়িটি। বাবা হয়তো মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতেন, ‘তুমি পেরেছ মা।’ কিন্তু সেই ঘরে মিষ্টি নেই, নেই কোনো উৎসব। ছিল শুধুই কান্না। গতকাল শনিবার এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু ফল জানার জন্য অপেক্ষা করা নাফিসা নাওয়াল আর নেই। ৭০ দিন ধরে যে মেয়েটি এই পৃথিবীর আলো-হাওয়ার বাইরে!
 
দিনটি ছিল ২২ আগস্ট, শনিবার। সকালবেলা। পতেঙ্গার বাসা থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে কাটগড়ের নেভি হাসপাতাল গেট এলাকায় মোবাইল ক্রেনের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়েন নাফিসা। মুহূর্তেই সেই ক্রেনের চাকার নিচে চলে যায় তাঁর শরীর। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি। সেদিন ছিল তাঁর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের পরীক্ষা। পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল হাজি মুহাম্মদ মহসিন কলেজ কেন্দ্রে। কিন্তু পরীক্ষার হলে পৌঁছানোর বদলে চলে গেলেন এমন এক ঠিকানায়, যেখান থেকে আর কোনোদিন ফিরবেন না। আরেক শনিবারে ফল প্রকাশের দিন সেই দুঃসহ স্মৃতি আরও একবার তাড়া করে ফিরেছে তাঁর পরিবারকে।
 
নাফিসার বাবা মামুন মিয়া ইপিজেডের একটি পোশাক কারখানার কোয়ালিটি ইনচার্জ। গতকাল ফোনে এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের প্রসঙ্গ তুলতেই ভারী হয়ে আসে তাঁর কণ্ঠ। বলেন, ‘সকালে বাসা থেকে বের হতে হতে মনে মনে ভাবছিলাম, আজ তো এইচএসসির রেজাল্ট দেবে। দেখতে পারতাম। মেয়ে বলেছিল, যেসব বিষয়ে পরীক্ষা দিয়েছে, সবই ভালো হয়েছে। হয়তো সেই ফল দেখে আনন্দ হতো, ঘরে মিষ্টির উৎসব হতো। কিন্তু রেজাল্টই দেখা হলো না। কী করব, সেটি দেখে-মেয়েই তো নেই! মেয়েকে ভেবে আমি আর তার মা আজ কেঁদেছি।’
 
চারটি পরীক্ষা ছাড়া বাকি পরীক্ষাগুলো দিয়েছিল নাফিসা। এখন বরগুনায় পারিবারিক কবরস্থানে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটি। চাকরির সুবাদে বাবা-মা থাকেন চট্টগ্রাম শহরে।
 
নাফিসা ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, আদরের রাজকন্যা। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে তাঁদের সেই মেয়েকে। নাফিসার ফেসবুক বায়োতে লেখা ছিল-‘এ স্ট্রং উইমেন’। সাহসী মেয়েটিকে ঘিরে বাবার স্বপ্নও ছিল অনেক বড়। সেই স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে মামুন মিয়া বলেন, ‘আমার মেয়ের উচ্চতা বেশ ভালো ছিল। সেজন্য সামরিক বাহিনীতে যোগ দেবে-সেই স্বপ্ন দেখছিলাম। মেয়েও সেভাবে নিজেকে গড়ে তুলছিল। কিন্তু আমার মেয়ে তো আজ সব স্বপ্নের ঊর্ধ্বে।’ 
 
নাফিসার ব্যবহার করা মুঠোফোন নম্বরটি এখন রয়েছে তাঁর ফুপি জুলেখা বেগমের কাছে। সেই নম্বরে ফোন করে নাফিসার কথা তুলতেই কেঁদে ফেলেন তিনি। বলেন, ‘ভাইয়ের মেয়ে হলেও নাফিসা ছিল আমার মেয়ের মতোই। আমাদের বাড়ির বড় আদরের মেয়েটা আজ নেই, ভাবতেই পারছি না। ও থাকলে ফল প্রকাশের দিনটি হতো আমাদের জন্য আনন্দের। এখন দিনটি এলো বুকভরা বেদনা নিয়ে। মেয়েটা থাকলে খুশির দিন হতো, আর এখন এই দিনটি মনেও করতে চাই না।’
 
নাফিসা ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) স্কুল এন্ড কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সক্রিয় ছিলেন নাফিসা। কলেজের ‘অগ্রণী হাউসের’ দলনেত্রী ছিলেন তিনি। বিচঞ্চল, অগ্রগামী সেই মেয়েটিকে ফল প্রকাশের দিনে খুব মনে পড়ছে শিক্ষকদেরও। তাঁদের একজন, কলেজের উপাধ্যক্ষ ববি বড়ুয়া পূর্বকোণকে বলেন, ‘নাফিসা খুবই প্রাণচঞ্চল, ভীষণ ভালো একটা মেয়ে ছিল। এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন তাকে খুব মনে পড়ছে। আমরা ওর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করব। বাবা-মাকে আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সান্ত¡না দেওয়া যায়, চেষ্টা করব।’ 
 
একটি ফলের অপেক্ষায় কত স্বপ্ন বুনেছিলেন নাফিসা, কত প্রত্যাশা ছিল বাবা-মায়ের! সেই প্রতীক্ষার দিন এসেছে, প্রকাশিত হয়েছে ফলও। কিন্তু ফল দেখার মানুষটিই নেই। যে মেয়েকে ঘিরে ঘরে মিষ্টি বিতরণের আয়োজন হওয়ার কথা ছিল, তার স্মৃতিতেই এখন ভারী হয়ে আছে বাড়ির বাতাস। কেটে যাবে দিন, শুধু নাফিসাকে হারানোর বিষাদ ফুরাবে না কোনোদিন।
 
পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট