চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় গত ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছে এবার। এ বছর পাসের হার ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ। এর আগে ২০০৪ সালে সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছিল, পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বছর ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এই দুই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে বোর্ডের সার্বিক ফলে। গতকাল শনিবার প্রকাশিত এইচএসসির ফল বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া যায়।
শুধু পাসের হার কমেনি, এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে দাঁড়িয়েছে অর্ধেকে। গতবার যেখানে ৬ হাজার ৯৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল, সেখানে এবার এ সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ৯২৯ জন।
তবে সার্বিকভাবে ফলাফল খারাপ হলেও এবছর নয়টি সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের মধ্যে পাসের হারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। যেখানে গত বছর পাসের হারে চট্টগ্রাম বোর্ডের অবস্থান ছিল পঞ্চম।
গতকাল বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী। তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার ত্রæটি ও দুর্বলতার পাশাপাশি ইংরেজি এবং আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক সংকটের কারণে এই দুই বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। সরকারের মেধার সঠিক মূল্যায়ন এবং কৃত্রিমভাবে নম্বর বাড়ানোর সংস্কৃতি থেকে সরে আসার নীতির কারণে হয়তো এবার জিপিএ-৫ কমেছে।
বরাবরের মতো এবারও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ ও পাসের হারে মেয়েরা এগিয়ে রয়েছেন। মেয়েদের পাসের হার ৫৩ দশমিক ৪৯ ও ছেলেদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। ছাত্রীদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ হাজার ৫৯৬ আর ছাত্রদের মধ্যে জিপিএ-৫ পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৩৩ জন। চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ১১৪ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় ২৮৩টি কলেজের ৯৯ হাজার ৮৭৯ জন পরীক্ষার্থী ছিল। এরমধ্যে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে ৯৬ হাজার ৩৩৫ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫০ হাজার ১৬৬ জন।
যেসব কারণে কমেছে পাসের হার:
শিক্ষাবিদরা বলছেন, ক্লাসে শেখানো ও পরীক্ষার পদ্ধতিতে ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা শিখছে কম। এতে পরীক্ষায় একটু ভিন্ন কাঠামোর প্রশ্ন এলেই তারা গুলিয়ে ফেলছে। অর্থাৎ যে বিষয় তারা পড়ছে, তাতে দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে না। এ কারণে পরীক্ষায় খারাপ করছে তারা।
শিক্ষাব্যবস্থার এ ত্রুটি ও দুর্বলতার পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রকট সংকটকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকতারা। বিশেষ করে ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের শিক্ষক সংকট প্রকট। এ কারণে এ দুই বিষয়ে অকৃতকার্য বেশি।
ইংরেজি-আইসিটির দক্ষ শিক্ষক সংকট:
দেশের স্কুল-কলেজগুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট প্রকট। যেসব শিক্ষক বিশেষায়িত এ বিষয়গুলোর ক্লাস নিচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই অন্য বিষয়ের ওপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। ফলে ক্লাসে তারা কার্যকরভাবে শিক্ষার্থীদের শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। পাশাপাশি কর্মরত শিক্ষকদের বড় একটি অংশের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, আমাদের পাসের হার গতবারের কাছাকাছি। এবার অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হয়েছে এবং অভিন্ন পদ্ধতিতে মূল্যায়ন হয়েছে। তাই মূল্যায়ন যথাযথ হয়েছে। সেকারণে হয় এ বছর জিপিএ-৫ অনেক কমেছে।
তিনি আরো বলেন, এবার প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ছিল। তাই শুরুর দুয়েকটি পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়ভীতি কাজ করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও পরীক্ষা কিছুদিন বন্ধ ছিল। ফল খারাপ হওয়ার পিছনে এটাও একটি কারণ হতে পারে।
জেলা ভিত্তিক পাসের হার:
এবছর শুধুমাত্র চট্টগ্রাম মহানগরে পাসের হার ৬৬ দশমিক ২০ শতাংশ। মহানগর ছাড়া চট্টগ্রাম জেলায় পাসের হার হচ্ছে ৪৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। কক্সবাজার জেলায় পাসের হার হচ্ছে ৪৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ, বান্দরবান জেলায় পাসের হার হচ্ছে ৪১ দশমিক ৪২ শতাংশ, রাঙামাটি জেলায় পাসের হার হচ্ছে ৩৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। সবচেয়ে কম পাসের হার হচ্ছে খাগড়াছড়ি জেলায়। সেখানে পাসের হার হচ্ছে ২৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
বিভাগ ভিত্তিক পাসের হার ও জিপিএ-৫:
বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবছরও বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে কম সংখ্যক পাসের হার হচ্ছে মানবিক শিক্ষা শাখায় এবং কম সংখ্যক জিপিএ-৫ পেয়েছে মানবিক শাখার শিক্ষার্থীরা। এবছর বিজ্ঞান বিভাগের মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২৩ হাজার ৯২৯ জন। বিজ্ঞান বিভাগের পাসের হার হচ্ছে ৭৪ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ১০৭ জন শিক্ষার্থী। ব্যবসায় শিক্ষা শাখা বিভাগের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৩১ হাজার ৬১৩ জন। সেখানে পাসের হার হচ্ছে ৫৪ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৩৭ জন শিক্ষার্থী। মানবিক বিভাগের মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৪৪ হাজার ৩৩৭ জন। মানবিকে পাসের হার হচ্ছে ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৮৫ জন শিক্ষার্থী।
পূর্বকোণ/ইবনুর


















