দুর্ঘটনায় দুই হাত হারিয়েও থেমে যায়নি পড়াশোনা। মুখ দিয়ে লেখা শুরু করে পরে আয়ত্ত করেছেন পা দিয়ে লেখার কৌশল। সেই পা দিয়েই এসএসসির পর এবার এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পেয়েছেন মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রাব্বি। তার স্বপ্ন, একদিন বিজ্ঞানী হবেন। পড়াশোনা করতে চান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের বজলুর রহমানের ছেলে রাব্বি। তিনি চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এর আগে ২০২৪ সালে ভাটিয়ারীর হাজী তোবারক আলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে পা দিয়ে লিখে এসএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন তিনি।
২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভাটিয়ারী ফুটওভার ব্রিজের ওপর এক মর্মান্তিক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের শিকার হন তিনি। বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে শরীর ঝলসে যাওয়ার পাশাপাশি প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। দীর্ঘ কয়েক মাসের চিকিৎসা শেষে প্রাণে বেঁচে গেলেও রক্ষা করা যায়নি তার দুই হাত—দুটোই কেটে ফেলতে হয়।
দুর্ঘটনার পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন রাব্বির শিক্ষাজীবনের এখানেই ইতি। কিন্তু সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দেন এই অদম্য তরুণ। জীবন সংগ্রামের কাছে হার না মেনে শুরু করেন মুখ দিয়ে লেখার লড়াই। এভাবেই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। এরপর লেখার গতি বাড়াতে পায়ের সাহায্য নেওয়ার কৌশল আয়ত্ত করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত নিজের পা দিয়েই সব পরীক্ষায় সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নিয়ে যাচ্ছেন রাব্বি।
রাব্বি জানান, দুর্ঘটনার পর মা-বাবা, শিক্ষকসহ অনেকেই তাকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। এছাড়া শুরু থেকেই স্থানীয় সাংবাদিকরা তার পাশে দাঁড়িয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাকে দারুণভাবে সহযোগিতা করেছেন। সবার আন্তরিক উৎসাহ আর নিজের দৃঢ় মনোবল ও চেষ্টার ফলেই আজ এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছেন তিনি। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী হওয়ার সুপ্ত বাসনা রাব্বির মনে। আর সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে চান এই অদম্য মেধাবী।
রাব্বির বাবা বজলুর রহমান বলেন, অভাব-অনটনের সংসারে তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই দৈনিক মজুরির কাজ করে সংসার চালান। ছেলের দুর্ঘটনার পর তার চিকিৎসা ও পড়াশোনা চালিয়ে নিতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করেছে। আইসিডিডিআরবির গবেষক ও চিকিৎসক ফেরদৌস কাদেরী রাব্বির পড়াশোনার খরচ বহন করে আসছেন। ওসমান নামের এক শিক্ষক তাকে বিনামূল্যে কোচিং করিয়েছেন। অনেকের সহযোগিতায় ছেলেকে চিকিৎসা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
রাব্বির বোন রোকাইয়া আক্তারও এবার রাউজার ভাটিয়ারী বিজয় সরণি কলেজের বাণিজ্য বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
ভাটিয়ারী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আনোয়ার বলেন, ‘রাব্বির চেষ্টা ছিল। শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হলেও সে নিজেকে কখনো প্রতিবন্ধী মনে করেনি। বরং অন্যরা যা পারে, সেও তা পারবে—এমন বিশ্বাস ছিল তার। আজ সেই বিশ্বাসেই তার এই সফলতা। সে পাস করায় আমরাও গর্ববোধ করছি।’
পূর্বকোণ/মিফতা/পারভেজ


















