স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, অতিরিক্ত ওজন না থাকা কিংবা নিয়মিত ওষুধ সেবনের পরও অনেকের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর পেছনে শুধু খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা কিংবা স্থূলতা নয়, মানুষের বংশগত বৈশিষ্ট্যও ভূমিকা রাখতে পারে।
চট্টগ্রামের একদল গবেষকের গবেষণায় উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জিনের বিশেষ পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণায় ইসিই১, এজিটি ও ইডিএন১ নামের তিনটি জিনের নির্দিষ্ট পরিবর্তনের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক শনাক্ত করেছেন গবেষকরা।
গবেষণাটি নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ার-এর ‘জিন রিপোর্টস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ডিজিজ বায়োলজি এন্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রুপ চট্টগ্রামের গবেষকরা যুক্ত ছিলেন। এতে অংশ নেন সাজিয়া আফরিন, ডা. মো. মাসুদ রানা, অধ্যাপক ড. আদনান মান্নান, শোয়াইব ইবনে হামিদ, আফরোজা আক্তার তান্নী, ড. এস. এম. রফিকুল ইসলাম ডা. আবুল ফয়সল মো. নুরুদ্দীন, ডা. ইমরুল কায়েস, ডা. এস. এম. রফিকুল ইসলাম, এইচ. এম. হামিদুল্লাহ মেহেদী, ডা. ফারহানা আক্তার।
গবেষণায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২২২ জন উচ্চ রক্তচাপের রোগী ও সুস্থ ব্যক্তির বংশগত তথ্য বিশ্লেষণ করে এ গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের প্রায় অর্ধেকের মধ্যে ইসিই১ ও এজিটি জিনের বিশেষ পরিবর্তনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এসব জিনগত পরিবর্তনের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপ নেই, এমন সুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যেও এ রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জিনগত পরিবর্তন রয়েছে। অর্থাৎ এসব পরিবর্তন ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে শরীরে এ ধরনের পরিবর্তন থাকলেই যে কারও উচ্চ রক্তচাপ হবে, তা নয়।
গবেষকদের মতে, মানুষের শরীরে থাকা কিছু জিন রক্তনালীর সংকোচন-প্রসারণ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এসব জিনের নির্দিষ্ট পরিবর্তন রক্তচাপের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বংশগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ও অন্যান্য কারণও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। ফলাফলে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের মধ্যে ইসিই১ ও এজিটি জিনের বিশেষ পরিবর্তনের উপস্থিতি উঠে এসেছে। নারীদের মধ্যে এসব বংশগত বৈশিষ্ট্যের সম্পর্কও বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি নির্ধারণে প্রচলিত কারণগুলোর পাশাপাশি বংশগত বৈশিষ্ট্যও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে এ গবেষণা।
গবেষণায় আধুনিক জিন বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের বংশগত বৈশিষ্ট্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে ইসিই১ জিনের নির্দিষ্ট পরিবর্তনের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, এ জিনের টিটি জিনোটাইপ বহনকারী নারীদের উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় ৫ দশমিক ৫ গুণ বেশি। অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি নির্ধারণে নারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করতে পারে।
সুস্থ মানুষের মধ্যেও রয়েছে ঝুঁকির বংশগত বৈশিষ্ট্য: গবেষণায় সুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত বংশগত বৈচিত্র্যের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বর্তমানে রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলেও কারও শরীরে এ ধরনের বংশগত বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তবে এসব পরিবর্তন থাকলেই ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপ হবে, এমনটি নিশ্চিত নয়।
গবেষকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ একটি বহুমাত্রিক রোগ। বংশগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, স্থূলতা, বয়স, পরিবেশ ও অন্যান্য জৈবিক উপাদানও এ রোগের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করে। ফলে শুধু বংশগত পরিবর্তনের ভিত্তিতে কারও রোগের ঝুঁকি বা ভবিষ্যৎ অবস্থা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
চিকিৎসায় খুলতে পারে নতুন পথ: গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। রোগীর জিনগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা নির্ধারণের পদ্ধতিকে বলা হয় ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা। এ পদ্ধতিতে কোন রোগীর জন্য কোন চিকিৎসা বেশি কার্যকর হতে পারে, তা নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়।
বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় রোগীর শারীরিক অবস্থা ও রক্তচাপের মাত্রা বিবেচনায় ওষুধ দেওয়া হয়। তবে গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে জিনগত বৈশিষ্ট্য ও ওষুধের কার্যকারিতার সম্পর্ক জানা গেলে রোগীভেদে চিকিৎসা নির্ধারণ আরও সহজ হতে পারে।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের বংশগত ভিত্তি সম্পর্কে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এসব বংশগত বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি, রোগের ঝুঁকি এবং চিকিৎসায় এর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করা গেলে ভবিষ্যতে জিনভিত্তিক চিকিৎসার পথ আরও সুগম হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে গবেষক অধ্যাপক ড. আদনান মান্নান বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ওপর আরও গবেষণা করা গেলে উচ্চ রক্তচাপের বংশগত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে। এতে ভবিষ্যতে রোগীর জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণের পথ তৈরি হতে পারে।
পূর্বকোণ/আদর


















