চট্টগ্রাম শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

পুরোনো ফুটওভার ব্রিজগুলোর ‘পরিণতি’ চান না নগরবাসী

চট্টগ্রামে হচ্ছে ৩৮টি ফুটওভার ব্রিজ

পুরোনো ফুটওভার ব্রিজগুলোর ‘পরিণতি’ চান না নগরবাসী

তাসনীম হাসান

৩১ অক্টোবর, ২০২৬ | ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম নগরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা নিউমার্কেট মোড়। এক পাশে জহুর হকার্স মার্কেট, মিউনিসিপ্যাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও বিভিন্ন বিপণিবিতান। অন্য পাশে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রিয়াজউদ্দিন বাজার। প্রতিদিন দুই পাশের মধ্যে সড়ক পারাপার হতে হয় হাজারো মানুষকে। পথচারীদের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে সেখানে বহু বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি ফুটওভার ব্রিজ। শুরুতে পথচারীরা সেটি ব্যবহারও করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিজটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত।

 

 

 

একসময় ব্রিজটির দুই পাশের রেলিংয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড লাগানো শুরু হয়। এতে বাইরে থেকে ভেতরের অংশ দেখা বন্ধ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সেখানে জমতে থাকে ময়লা-আবর্জনা ও দোকানিদের ফেলে রাখা জিনিসপত্র। একপর্যায়ে ব্রিজটিতে আশ্রয় নিতে শুরু করেন ছিন্নমূল মানুষ। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধ্যার পর এটি কার্যত অন্ধকারে ডুবে থাকে। এই সুযোগে ছিনতাইসহ নানা অপরাধের ঘটনাও ঘটে। ফলে নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য নির্মিত ব্রিজটিই এখন অনেকের কাছে এড়িয়ে চলার জায়গা।

 

 

 

প্রায় একই চিত্র নগরের মুরাদপুর এলাকার ফুটওভার ব্রিজেও। ব্যস্ততম এই ব্রিজে সাম্প্রতিক সময়ে ছিন্নমূল মানুষের বসবাস বেড়েছে। রাতের দিকে অপরাধীদের আনাগোনার অভিযোগও রয়েছে। এতে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুরোনো ফুটওভার ব্রিজগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দামপাড়া এলাকার ব্রিজটি। নগর পুলিশের কার্যালয়, পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুল অ্যান্ড কলেজের গেটসংলগ্ন হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এটি ব্যবহার করেন। কিন্তু সেখানেও ছিন্নমূল মানুষের অবস্থান দেখা যায়। গতকাল ব্রিজটিতে গিয়ে দেখা যায়, এসএমসি ওরস্যালাইনের একটি বিশাল বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড লাগানো হয়েছে। ভেতরের দিকেও সাঁটানো হয়েছে বিভিন্ন পোস্টার। এতে ব্রিজের একাংশ বাইরে থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। ফলে ভেতরে কী ঘটছে, তা বাইরে থেকে সহজে বোঝার উপায় নেই।

 

 

অন্যদিকে, জাকির হোসেন সড়কে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের প্রবেশপথের সামনে নির্মাণ করা হয়েছিল নগরের একমাত্র চলন্ত সিঁড়িসম্বলিত ফুটওভার ব্রিজ। চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেই ব্রিজটি প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ। বর্তমানে সেটি মাদকসেবীদের আড্ডাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পুরোনো ফুটওভার ব্রিজগুলোর এমন অভিজ্ঞতার মধ্যেই নগরে নতুন করে ৩৮টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নগরের ৩১টি ব্যস্ততম মোড় ও এলাকায় এসব ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ২১টির কাজ চলমান এবং নয়টির দরপত্র প্রক্রিয়াধীন। এই ৩৫টি ব্রিজ নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে চসিক। বাকি তিনটি নির্মাণের দায়িত্বে আছে সিডিএ।

 

 

গতকাল জিইসি মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দুই পাশ থেকে দুটি সংযোগ ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এখনো চালু হয়নি এটি। জিইসি মোড়ের আশপাশে রয়েছে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, রোগী, স্বজন, শিক্ষক, চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এই এলাকায় চলাচল করেন। তাঁদের নিরাপদে সড়ক পারাপারে ব্রিজটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

 

 

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, নতুন ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের সময় থেকেই নিরাপত্তা ও ব্যবহারবান্ধব নকশার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। সেটি মনে করিয়ে দিয়ে বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া পূর্বকোণকে বলেন, ‘রেলিং এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে বাইরে থেকে ব্রিজের ভেতরের পুরো অংশ দেখা যায়। রেলিংয়ে বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড, ব্যানার ও পোস্টার লাগানোর সুযোগ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত আলোকব্যবস্থা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তা তদারকিও নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে পুরোনোগুলোর মতো একসময় নতুন ব্রিজগুলো থেকেও মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবেন।’

 

 

 

চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘জনগণের ব্যবহারের জন্য ফুটওভার ব্রিজগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে। সেগুলো নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হবে। আর রেলিংগুলো যাতে বাইরে থেকে দৃশ্যমান থাকে, সে ব্যবস্থাও করা হবে।’ দামপাড়া এলাকার ফুটওভার ব্রিজে বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড স্থাপনের বিষয়ে চসিকের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘অনুমোদন নিয়ে ফুটওভার ব্রিজটির শুধু একাংশে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে।’

 

 

জিইসি এলাকায় কথা হয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শামসুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নিউমার্কেট বা মুরাদপুরের ফুটওভার ব্রিজের মতো নতুনগুলোও যেন পরিত্যক্ত ও অনিরাপদ হয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে এখনই পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। পথচারীদের শুধু সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা করলেই হবে না, নিরাপদে চলাচলের নিশ্চয়তাও দিতে হবে।’

 

 

 

নগরে নতুন ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। ব্রিজগুলো ব্যবহার উপযোগী রাখা, আলো জ্বালানো, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং অনিয়ম-দখল ঠেকানোর দায়িত্বও নিতে হবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে। নইলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন ব্রিজগুলোও একসময় পরিণত হবে পুরোনোগুলোর মতোই। থাকবে শুধু অবকাঠামো, হারিয়ে যাবে মানুষের ব্যবহার!

 

 

পূর্বকোণ/আদর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট