দেশে বিশ্বমানের সুপার এনামেল তামার তার তৈরি করে সুনাম কুড়িয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান গাজী ওয়্যারস। প্রতিষ্ঠার পর থেকে লাভের ধারা অক্ষুণ্ণ রেখেছিল এ প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে ক্রমাগত লোকসান গুনে লাভের গাজীতে ছন্দপতন ঘটে। এজন্য মিলটির ব্যবস্থাপনার অনিয়ম-দুর্নীতি ও ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতাকে দায়ী করেছেন কর্মচারীরা। তবে লাভের আশার আলো দেখাচ্ছেন বর্তমান কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে চলে আসা কারখানায় বর্তমানে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কাঁচামাল সংকটের কারণে মাসখানেক ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
১৯৬৫ সালে নগরীর কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকায় গাজী ওয়্যারস প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করে এটিকে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) সঙ্গে একীভূত করা হয়। এই কারখানায় তৈরি তামার তার প্রধানত ট্রান্সফর্মার, বৈদ্যুতিক মোটরসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তৈরি ও মেরামতের কাজে ব্যবহার করা হয়। কপার ওয়্যার আমদানি করে এসব তামার তার উৎপাদন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ছিল গাজী ওয়্যারসের বড় ক্রেতা। এছাড়া পিডিবি, ডিপিডিসি, ডেসকো, পিজিসিবিসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই কারখানার গ্রাহক ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বড় কর্মকর্তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঁতাত করে বড় ক্রেতাদের কৌশলে সরিয়ে দিয়েছেন। সংস্কার ও সম্প্রসারণের নামে অর্ডার বাতিল করা, নতুন অর্ডার না নেওয়া ও নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অদক্ষতা ও কর্মকৌশলের অভাবে বড় বাজার হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশে না করার শর্তে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি)। প্রতিবছর গড়ে ৪০০ টন তার ক্রয় করত প্রতিষ্ঠানটি। ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত তার কিনেছিল বিআরইবি। এরপর তার কেনা বন্ধ করে দিলে লোকসানের মুখে পড়ে গাজী ওয়্যারস।
একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতাই লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করেন গাজী ওয়্যারস সিবিএ’র যুগ্ম সম্পাদক মাসুদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে লোকসান গুনে আসছে। বড় ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় বাজার ছোট হয়ে এসেছে। উৎপাদন কমে আসায় প্রায়শই মেশিন বন্ধ রাখতে হয়।’ তিনি বলেন, কাঁচামাল সংকটের কারণে মাসখানেক ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদনেও উঠে এসেছিল, ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে দিন দিন বাজার হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বন্ধ সরকারি কল-কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম শুরু করা হয়। ব্যবস্থাপনা কমিটিতে নতুন নেতৃত্ব আনা হয়। কাঁচামাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। গাজী ওয়্যারসেও নতুন নেতৃত্ব আনা হয়। লাভে ফেরার আশা দেখাচ্ছেন নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটি।
গাজী ওয়্যারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) হুমায়ুন কবির পূর্বকোণকে বলেন, ‘পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এখন ফিরে আসছে। প্রায় ৫০ শতাংশ তার কিনছে প্রতিষ্ঠানটি।’
কাঁচামালের সংকটে প্রায় মিল বন্ধ রাখতে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আশা করছি, দুই মাসের মধ্যে ভালো অবস্থানে ফিরবে। আমদানি করা কাঁচামাল পৌঁছালে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হবে। তখন লাভে ফিরবে প্রতিষ্ঠানটি।’
আধুনিকীকায়ণ প্রকল্পে লুট :
দেশের মোট তারের চাহিদার ২০ শতাংশ পূরণ করত রাষ্ট্রায়ত্ত এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি। ২০১৭ সালে উৎপাদন ৫০ শতাংশে উন্নীতকরণের উদ্যোগ নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। পরের বছর (২০১৮ সাল) ৬৯ কোটি টাকার প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক কমিটির সভায় (একনেক) অনুমোদন পায়। প্রকল্পের আওতায় একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ, ৯টি ভারী মেশিনারিজ ক্রয় ও অন্যান্য নির্মাণ কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পের কেনাকাটায় বড় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেছিল। গাজী ওয়্যারস এমপ্লয়িজ এসোসিয়েশনের অভিযোগ তুলেছির, রক্ষকেরা ভক্ষকে পরিণত হয়। প্রকল্পে ২৫ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছিল।
২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এই অভিযোগ করেছিলেন শ্রমিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম মোস্তফা। তিনি দাবি করেছিলেন, ‘মেশিনগুলো বছর না যেতেই অকেজো হয়ে পড়ছে। কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতি ও জালিয়াতি করা হয়েছে।’
দুর্নীতি-জালিয়াতির সত্যতা :
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ইস্পাত ও প্রকৌশলী করপোরেশন পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তিন কমিটির তদন্ত, পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশমালা সমন্বয় করে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিএসইসির তৎকালীন সচিব মো. নাজমুল হক প্রধান দুদক চেয়ারম্যানকে এই চিঠি দিয়েছিলেন। চিঠিতে তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পেয়ে মামলা দায়ের করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর ফলে প্রকল্প পরিচালক আখতার হোসেন, উপ-পরিচালক তাজুল ইসলাম ও এমডি ডা. গোলাম কবীরের চাকরিচ্যুত এবং এমডির বেতন-ভাতা এবং পেনশন স্থগিত করা হয়েছিল। গাজী ওয়্যারস সিবিএর যুগ্ম সম্পাদক মাসুদুর রহমান পূর্বকোণকে বলেন, ‘শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি এখন লোকসান গুনছে।
লাভ-ক্ষতির খতিয়ান :
গাজী ওয়্যারসের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে প্রতিষ্ঠানটি লাভ করেছিল ১১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। পরের দুই বছর লাভের অঙ্ক আরও বড় হয়। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে লাভ হয় ১৫ কোটি ৮৮ লাখ এবং ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ১৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এরপর থেকে লাভের সূচক টানা কমতে থাকে। ২০২০-২১ সালে লাভ হয় ২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। পরের তিন বছর লাভ-ক্ষতির উত্থান-পতন ঘটে। ২০২১-২২ সালে লোকসান হয় ৫৫ লাখ টাকা। আবার ২০২২-২৩ সালে লাভ হয় ১৩ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে লোকসান গুনতে হয় ৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ২০২৪-২০২৫ সালে ক্ষতি ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
ক্রমাগত লোকসানের মধ্যে আগামী বছর থেকে শুরু হচ্ছে ঋণের বোঝা। কর্মকর্তারা জানান, আগামী বছর থেকে শুরু হচ্ছে ঋণের কিস্তি পরিশোধের পালা শুরু হবে। তবে ততদিনে লাভে পৌঁছে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান।
পূর্বকোণ/মিফতা



















